ব্যবস্থাপনার নীতি বা আদর্শসমূহ

ব্যবস্থাপনার নীতি বা আদর্শসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। Principles of Management নীতি হলো সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এমন কোনো বিবৃতি বা বিষয় যা কার্য সম্পাদনের সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে । নীতির বৈশিষ্ট্য হলো স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এরূপ নির্দেশিকার সফল প্রয়োগে যথার্থ ফল লাভ সম্ভব ।

Table of Contents

ব্যবস্থাপনার নীতি বা আদর্শসমূহ

ব্যবস্থাপনা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ন্যায় বিশুদ্ধ বিজ্ঞান নয় বিধায় একে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। তাই এক্ষেত্রে সকল মূলনীতির প্রয়োগে সবসময় সমান ফলাফল প্রত্যাশা করা যায় না । তথাপি ব্যবস্থাপনা বিশারদগণের অনেকেই এক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য কতিপয় সাধারণ মূলনীতি উদ্ভাবনের প্রয়াস পেয়েছেন। এর মধ্যে F. W. Taylor, L. Urwick, Henri Fayol প্রমুখ মনীষীর নাম উল্লেখযোগ্য । প্রথম দু’জনের প্রদত্ত মূলনীতিসমূহ নিম্নরূপ :

 

ব্যবস্থাপনার নীতি বা আদর্শসমূহ | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

 

আধুনিক ব্যবস্থাপনা তত্ত্বের জনক Henri Fayol ১৯১৬ সালে তার ‘Administration Industrielle et General গ্রন্থে ১৪টি মূলনীতির নির্দেশ করেন । যা অদ্যাবধি সারা বিশ্বে সকল মহলে স্বীকৃত হয়ে আসছে। Robert Kreitner, “Fayol’s principles have withstood the test of time because of their wide-spread applicability. “30 অর্থাৎ ফেওল প্রদত্ত নীতিমালা এর ব্যাপক ভিত্তিক প্রয়োগযোগ্যতার কারণে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে । নিম্নে ফেওল প্রদত্ত মূলনীতিসমূহ উল্লেখ করা হলো :

১. কার্যবিভাগ বা কার্য বিভাজন (Division of work) :

প্রতিষ্ঠানের কাজকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সুষ্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করার নীতিকেই কার্য বিভাজনের নীতি বলে । এরূপ বিভাজনের ফলে প্রত্যেক বিভাগ, উপবিভাগ এবং সেইসঙ্গে এতে নিয়োজিত জনশক্তির কাজ সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয় । ফলে বিশেষায়ণের সুযোগ লাভ ঘটে ।

Bartol ও Martin ফেওলের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, “Work specialization can result in efficiencies and is applicable to both managerial and technical functions.”31 অর্থাৎ শ্রম বিশেষায়ণ দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম এবং তা ব্যবস্থাপকীয় ও কারিগরি উভয় ধরনের কাজের ক্ষেত্রেই প্রয়োগযোগ্য ।

২. কর্তৃত্ব ও দায়িত্বে সমতা রক্ষণ (Balancing authority and responsibility) :

কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কর্তৃত্ব হলো আদেশ দানের অধিকার। অন্যদিকে দায়িত্ব হলো জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা । এই অধিকার ও বাধ্যবাধকতায় সমতা রাখার নীতিকেই ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব ও কর্তৃত্বে সমতা রক্ষণের নীতি বলে । মানুষ দিয়ে কাজ করাতে হলে তাকে প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব অর্পণ করতে হয়। এর ফলে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর দায়িত্বও বর্তে। এরূপ দায়িত্ব ও কর্তৃত্বে সমতা রক্ষণ আবশ্যক। কারণ কর্তৃত্ববিহীন দায়িত্ব পালন সম্ভব নয় ।

অন্যদিকে দায়িত্ববিহীন কর্তৃত্ব স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম দেয়। R. M. Hodgetts এ সম্পর্কে বলেছেন, “Authority, which is the right to command, should always be equal to responsibility. অর্থাৎ কর্তৃত্ব হলো আদেশ দেয়ার অধিকার, যা সব সময়ই সমপরিমাণ দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। 

৩. নিয়মানুবর্তিতা (Discipline) :

প্রতিষ্ঠানের জন্য উত্তম নিয়ম-নীতি নির্ধারণ এবং তা মেনে চলার নীতিকেই ব্যবস্থাপনায় নিয়মানুবর্তিতার নীতি বলে। প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম-নীতি এবং ঊর্ধ্বতনের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাবোধ এবং আনুগত্যের সাথে নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কযুক্ত । প্রতিষ্ঠানের সবাই যদি নিয়ম-নীতি ও সেই সঙ্গে ঊর্ধ্বতনদের মেনে চলে তবে কখনই প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে না। R.M. Hodgetts, “Discipline requires obedience, diligence and a proper attitude on the part of employees. “33 অর্থাৎ নিয়মানুবর্তিতার জন্য প্রয়োজন কর্মীদের বাধ্যতা, অধ্যবসায় এবং অনুকূল মনোভাব । আর এটা নিশ্চিত করার স্বার্থে Fayol বলেছেন, “Discipline requires good superiors at all levels. “

৪. আদেশের ঐক্য (Unity of command) :

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রত্যেক কর্মীর আদেশদাতা হবে একজন মাত্র ব্যক্তি-এ নীতিকেই আদেশের ঐক্য নীতি বলে। অর্থাৎ একজন কর্মী প্রত্যক্ষভাবে একজন মাত্র ঊর্ধ্বতনের অধীনে থাকবে (Everyone should have one and only one boss)। একজন কর্মী সে যার প্রত্যক্ষভাবে অধীন থাকবে তার কাছ থেকেই নির্দেশ লাভ করবে এবং কাজের রিপোর্ট ঐ ঊর্ধ্বতনের কাছেই প্রদান করতে বাধ্য থাকবে । Weinrich ও Koontz এ সম্পর্কে বলেন, “Unity of command means that employees should receive orders from one superior only. “35 এর ফলে প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত অধীনতা (Dual subordination) সৃষ্টির সুযোগ হ্রাস পায় ।

৫. নির্দেশনার ঐক্য (Unity of direction) :

আগের নির্দেশনার সাথে মিল রেখে পরবর্তী নির্দেশনা প্রদানকেই নির্দেশনার ঐক্য নীতি বলে । এ নীতির অর্থ হলো প্রদত্ত নির্দেশনাসমূহ অবশ্যই একটা প্রধান উদ্দেশ্য বা মৌল পরিকল্পনা সামনে রেখে দিতে হবে। এভাবে প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায় থেকে বিভাগ ও উপবিভাগ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মপ্রচেষ্টা একক লক্ষ্যকেন্দ্রিক হবে। উৎপাদন বিভাগ যে উদ্দেশ্য সামনে রেখে পরিকল্পনা নেবে এর অধীনে উপবিভাগসমূহ অবশ্যই ঐ মূল পরিকল্পনার আওতায় নির্দেশনা লাভ করবে । ফলে সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। Bartol ও Martin বলেছেন, “Unity of direction means activities aimed at the same objective should be organized so that there is one plan and one person in charge. 

 

৬. সাধারণ স্বার্থে নিজস্ব স্বার্থ ত্যাগ (Subordination of individual interest to general interest) :

ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে প্রাতিষ্ঠানিক বা সাধারণ স্বার্থকে অগ্রাধিকার প্রদানের নীতিকেই ব্যবস্থাপনায় সাধারণ স্বার্থে নিজস্ব স্বার্থ ত্যাগ এর নীতি বলে । এরূপ নীতির অর্থ হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে সর্বদা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া উচিত। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জিত হলে এতে প্রতিষ্ঠানের সকলের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে । ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব পেলে এতে দলীয় চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একপর্যায়ে কার্যত সবাই ক্ষতি স্বীকারে বাধ্য হয়। Bartol ও Martin ফেওলের লেখাকে উদ্ধৃত করে এ বিষয়ে বলেছেন, “The interest of one employee or group should not prevail over the interest and goals of the organization. 

৭. পারিশ্রমিক (Remuneration) :

প্রতিষ্ঠানের প্রতিটা কর্মীর কাজের প্রকৃতি, মেধা, যোগ্যতা ইত্যাদি বিবেচনায় উপযুক্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের নীতিকেই ব্যবস্থাপনায় পারিশ্রমিকের নীতি বলে । যে কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল জনশক্তি শ্রম প্রদানের বিনিময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রত্যাশা করে। তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীদের সবাইকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পারিশ্রমিক প্রদান করা উচিত । মালিকপক্ষও যাতে উপযুক্ত মুনাফা পায় প্রতিষ্ঠান থেকে তারও ব্যবস্থা করা আবশ্যক । Griffin ফেওলের বক্তব্যকে তুলে ধরে বলেছেন, “Compensation for work done should be fair to both employees and employers. অর্থাৎ কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনের জন্য কর্মী ও নিয়োগকারী প্রত্যেককেই ন্যায্য প্রতিদান দেয়া উচিত । 

৮. কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ (Centralization & decentralization) :

প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যবস্থাপনার কোন পর্যায়ে গ্রহণ করা হবে এ বিষয়ক নীতিকেই কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের নীতি বলে । প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কতটুকু ক্ষমতা এর কোন্ পর্যায়ে সংরক্ষিত রাখা হবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শীর্ষ নির্বাহীদের উপরে থাকায় অধিকতর কর্তৃত্ব অবশ্যই তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা আবশ্যক।

তবে অধস্তন নির্বাহীগণকেও সামগ্রিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব দেয়া উচিত। অর্থাৎ এক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। Stoner ও অন্যরা লিখেছেন, “Fayol believed that managers should retain final responsibility but should at the same time give their subordinates enough authority to do their jobs properly.” –

৯. জোড়া-মই-শিকল (Scalar chain) :

প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে শুরু করে একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক নিয়মে প্রতিটা ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগকে একে অন্যের সাথে যুক্ত করে দেয়ার বা একই শিকলের অধীনে সবাইকে আবদ্ধ করার নীতিকেই ব্যবস্থাপনায় জোড়া-মই-শিকল নীতি বলে। এ নীতিকে অনেকে স্তর বিন্যাসের নীতি বলেও আখ্যায়িত করেছেন । এর মূলকথা হলো প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কর্তৃত্ব শৃঙ্খল এমনভাবে নেমে আসবে যাতে একটা স্তরের সঙ্গে অন্যস্তর সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়ে।

এভাবে প্রতিটা বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তি কর্তৃত্বের শিকলে কারও না কারও সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকবে । এরূপ শিকল অবশ্যই কর্তৃত্বের প্রবাহ ও যোগাযোগের পথ নির্দেশ করবে। Hodgetts বলেছেন, “A scalar (hierarchical) chain of authority extends from the top to the bottom of an organization and defines the communication path. ” । নিম্নে এ প্রবাহ রেখাচিত্রে প্রদর্শিত হলো :

১০. শৃঙ্খলা (Order) :

এরূপ নীতির লক্ষ্য হলো যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে এবং উপযুক্ত বস্তুকে সঠিক স্থানে স্থাপন করতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানে মানব শৃঙ্খলা ও বস্তুগত শৃঙ্খলা বিধান করা সম্ভব হয় । এ ছাড়াও সকল ব্যক্তি ও বস্তুগত উপাদান যাতে প্রতিষ্ঠানে সঠিক নিয়মে শৃঙ্খলার সঙ্গে কার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয় তারও ব্যবস্থা করতে হবে । Hodgetts এরূপ নীতি সম্পর্কে বলেছেন, “Materials should be kept in well-chosen places that facilitate activities. Similarly due to good organization and selection, the right person should be in the right place. “

 

ব্যবস্থাপনার নীতি বা আদর্শসমূহ | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১১. সাম্যতা (Equity) :

কর্মীদের প্রতি সমান আচরণ বা স্নেহ প্রদর্শন করা এ নীতির লক্ষ্য। যাতে অধস্তনরা ঊর্ধ্বতনের প্রতি উত্তম মনোভাব এবং যথাযথ শ্রদ্ধা ও আনুগত্য পোষণ করতে পারে। ঊর্ধ্বতন যদি অধস্তন প্রত্যেকের প্রতি সমান আচরণ প্রদর্শন করেন, ভালো ব্যবহার করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন তবে অধস্তনরা কাজ করতে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বুদ্ধ হবে। এতে ঊর্ধ্বতন অধস্তন সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে। Griffin এরূপ নীতির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, “Managers should be kind and fair when dealing with subordinates. “42 অর্থাৎ ব্যবস্থাপকগণ কার্যক্ষেত্রে অধস্তনদের সঙ্গে দয়ার্দ্র ও উত্তম আচরণ প্রদর্শন করবেন।

১২. কর্মীদের চাকরিকালের স্থায়িত্ব বিধান (Stability of tenure of personnel) :

এরূপ নীতির আওতায় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব বিধানের কথা বলা হয়েছে। কর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব বিধান করা হলে কর্মীদের মাঝে নিরাপত্তাবোধ ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পায়। প্রতিষ্ঠানকে তারা আপন করে ভাবতে শেখে । এর ফলশ্রুতিতে কর্মীদের কর্মস্থল ত্যাগের হার কমে । অন্যথায় তা বৃদ্ধি পায় । এর ক্ষতি সম্পর্কে Stoner, “A high employee turnover rate undermines the efficient functioning of an organization. “43

১৩. উদ্যোগ (Initiative ) :

যে কোনো পর্যায়ে কর্মরত কর্মী তার আওতাধীন কাজ নিয়ে যাতে ভাবতে পারে, কাজের উন্নয়ন সাধন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করাই এরূপ নীতির উদ্দেশ্য। ঊর্ধ্বতনদের পক্ষ থেকে কর্মীদের নিজস্ব পরিসরে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের যদি সুযোগ দেয়া হয় তবে তা কর্মীদের মাঝে কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে । এরূপ নীতির ভালো দিক তুলে ধরে ট্রিওয়াথা ও নিউপোর্ট বলেন, “The ability to think through and execute a plan is a powerful motivator of human behaviour. 

১৪. একতাই বল (Esprite de corps) :

এরূপ নীতির মূলকথা হলো ঐক্যবদ্ধ দলীয় চেতনা ছাড়া কখনই প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জন সম্ভব নয়। এজন্য ঐক্য বিনষ্টকারী সকল কর্মকাণ্ড সবাইকে পরিহার করে চলা উচিত । ছোট ছোট বিষয় অনেক সময় বড় আকার ধারণ করে প্রতিষ্ঠানের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে । এ বিষয়ে সবারই সতর্ক থাকা প্রয়োজন । Kreitner এরূপ নীতির যথার্থতা তুলে ধরে বলেন, “Harmonious efforts among individuals is the key to organizational success. “45 অর্থাৎ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কর্মপ্রচেষ্টা প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠিস্বরূপ ।

Fayol বর্ণিত উপরোক্ত মূলনীতিসমূহ ছাড়াও বর্তমানে আরও কিছু নীতি ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনায় সাধারণ দিক-নির্দেশনা প্রদান করতে পারে বলে মনে করা হয় :

১. সহযোগিতার নীতি (Principle of co-operation) :

এরূপ নীতি অনেকটা ফেওলের ‘একতাই বল’ নীতির সমার্থক। এ নীতির মূলকথা হলো প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরে একে অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে । ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, বিভাগে-বিভাগে, ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে । এতে প্রতিষ্ঠানের কার্য পরিবেশে গতিশীলতার সৃষ্টি হবে ।

২. নমনীয়তার নীতি (Principle of flexibility) :

ব্যবস্থাপনা সমাজ বিজ্ঞানের একটি শাখা। তাই সামাজিক বিভিন্ন পরিবর্তিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে ব্যবস্থাপনাকে তার উদ্দেশ্য অর্জন করতে হয়। তাই এরূপ নীতির মূল বক্তব্য হলো পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে সঙ্গতি বিধানে ব্যবস্থাপনার সমর্থ থাকা উচিত । এজন্য ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যে পরিবর্তন ঘটে তার সঙ্গে ব্যবস্থাপনাকে সঙ্গতি বিধান করে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে ।

৩. ভারসাম্যের নীতি (Principle of balancing) :

ভারসাম্যের নীতি বলতে প্রতিটা ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগীয় কাজের মধ্যে সমন্বয় বিধান এবং সমতালে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য সৃষ্টিকে বুঝায় । কোনো বিভাগের কাজের দায়িত্ব এবং গুরুত্ব বুঝে লোকবল ও সামর্থ্য নিয়োজিত করা উচিত; যাতে কোন বিভাগ অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে না পড়ে । সকল বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তির কাজ ভারসাম্যপূর্ণ হলে তা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কাজে ভারসাম্যাবস্থার সৃষ্টি করে ।

৪. সর্বজনীনতার নীতি (Principle of universality) :

এরূপ নীতির মূলকথা হলো ব্যবস্থাপনা একটি সর্বজনীন বিষয় । যেখানেই পরিচালনার প্রশ্ন সেখানেই ব্যবস্থাপনার উপস্থিতি বিদ্যমান। একটা প্রতিষ্ঠানের একেবারে নিচের স্তর বাদ দিয়ে এর ওপরে সবাই কম-বেশি পরিচালনা কার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই প্রতিষ্ঠানের ব্যব, নীতি (ব্যব, মার্কে.)–৩(ক)-F-3 সকল স্তরেই ব্যবস্থাপনার উপস্থিতি রয়েছে শীর্ষ নির্বাহীদেরকে তা ভাবতে হবে এবং তাদের সেভাবে উন্নয়ন। মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।

৫. ব্যতিক্রমের নীতি (Principle of exceptions) :

ব্যবস্থাপক কোন্ ক্ষেত্রে তার দৃষ্টি অধিক নিবন্ধ করবে। এরূপ নীতিতে তার প্রতি আলোকপাত করা হয়ে থাকে । একজন ব্যবস্থাপকের পক্ষে তার সবগুলো কাজ সমান। গুরুত্ব দিয়ে করা সম্ভব হয় না। এজন্য কোন্ কাজটি উদ্দেশ্য অর্জনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কোন্ ক্ষেত্রে অধিক বিচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা বিদ্যমান ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সেভাবে দৃষ্টি প্রদান এবং ব্যবস্থাপনা কার্য পরিচালনা। করা আবশ্যক।

উপসংহারে বলা যায়, ব্যবস্থাপনাকে তার কার্য সুচারুরূপে সম্পাদন করে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে উপরোক্ত মূলনীতিসমূহের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে এর কোনো কোনো মূলনীতির অনুসরণ না করেই কার্যক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থাপক ভালো ফল অর্জন করেছেন বলে প্রমাণ মেলে তথাপি সামগ্রিক বিবেচনায় এর সকল মূলনীতিই প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ফল প্রদানে সক্ষম ।

Leave a Comment