আন্তর্জাতিক/বৈশ্বিক পরিবেশের উপাদানসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিবেশ” বিষয়ক পাঠের অংশ। বর্তমানকালে বৃহদায়তন ব্যবসায় পরিচালনায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান হিসেবে গণ্য। কারণ বিশ্বায়নের প্রভাবে সারাবিশ্ব এখন একটা পাড়ায় বা গ্রামে পরিণত হতে চলেছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি আর তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন বিষয় সর্বদাই ব্যবসায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে । নিম্নে আন্তর্জাতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান আলোচনা করা হলোঃ
Table of Contents
আন্তর্জাতিক/বৈশ্বিক পরিবেশের উপাদানসমূহ

১. বৈশ্বিক ব্যবসায় পরিবেশ (Global business environment) :
বিশ্বায়নের প্রভাব বিশ্ব ব্যবসায় পরিবেশে আজ এক নতুন আবহ সৃষ্টি করেছে। বৃহদায়তন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানকালে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে সারা বিশ্ব জুড়ে তারা যৌথ উদ্যোগে নতুন নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে । তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির কারণে এখন বিদেশী পণ্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর গ্রহণ, তথ্য- বিনিময়, ফরমায়েশ প্রদান সহ যোগাযোগ অনেক সহজসাধ্য হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, ভারত ব্রাজিলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নতুন ব্যবসায় কার্যক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে বসেছে। ফলে বিশ্ব ব্যবসায় পরিবেশ এখন নতুন রূপ পরিগ্রহ করতে বসেছে ।
২. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ (Global economic environment) :
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজি আজ বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মূলধনের গতিশীলতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধনিক দেশগুলোর পুঁজি গরীব ও সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে বিনিয়োগ হচ্ছে । বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন আঞ্চলিক চুক্তি বা জোট তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ নীতি তার গুরুত্ব হারিয়েছে ।
৩. বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবেশ ( Global science and technological environment) :
সারা বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এক নতুন পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিতে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করছে । এ কারণে সারা বিশ্বের এনার্জি সেক্টর কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার কতিপয় মিত্র দেশের অধীনে চলে গেছে । তথ্য প্রযুক্তি (1.T.) -এর উন্নয়নের সুবাদে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে । উৎপাদন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহারের ফলে সারা বিশ্বে উৎপাদনধর্মী কাজে কম জনশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে । সেবাধর্মী কাজে এখন অধিক জনবল কাজ করছে এর সুবাদেই । গরীব দেশগুলো প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকার কারণে সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়েছে।
৪. বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ (Global cultural environment) :
সারা বিশ্বে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এক ধরনের পরিবেশ গড়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়নের কারণে বিভিন্ন দেশে আবহমানকাল থেকে চলে আসা স্বকীয় সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশ্বের সকল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুয়ার সারা বিশ্বের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য উম্মুক্ত করা হচ্ছে । পোশাকে-আশাকে, কথা-বার্তায়, চলন-বলনে, আচার-ব্যবহারে, খাদ্য-খানায় যেনো বিশ্বায়নের প্রভাব পড়েছে। শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলোর কারণে সারা বিশ্বের নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বিশ্বায়নের জোয়ার বইছে ।
৫. বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ (Global political environment) :
বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন দিকও আন্তর্জাতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ । এরূপ রাজনীতির কারণেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভিন্ন সহযোগিতামূলক চুক্তি সম্পাদিত হয় । ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে যে ব্যবসায়িক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্বারাই অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক শক্তিশালী অবস্থানের কারণে বিভিন্ন দেশ বা তাদের সরকারগুলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভের স্বার্থে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক তাদের পক্ষই সমর্থন করছে । বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির মত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশ্ব রাজনীতির কূটচালে আবর্তিত হচ্ছে ।

৬. বৈশ্বিক আইন পরিবেশ (Global legal environment) :
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন প্রণীত হওয়ায় সমগ্র বিশ্বে এক ধরনের আইনগত পরিবেশ গড়ে উঠেছে। কপিরাইট আইন, মুদ্রা বিনিময় নিয়ন্ত্রণ আইন, শিশুশ্রম বন্ধের আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন, মানি লণ্ডারিং আইন, শুষ্ক আইন, অভিবাসন সংক্রান্ত আইন, আন্তর্জাতিক সীমানা সংক্রান্ত আইন ইত্যাদি নানান ধরনের আইনের কারণে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো বা এরূপ সনদে স্বাক্ষরকৃত দেশগুলো তা মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
