ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল বা তত্ত্ব

সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল বা তত্ত্ব নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সিদ্ধান্ত গ্রহণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যত সতর্কতাই অবলম্বন করা হোক না কেন এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, একজন ব্যবস্থাপক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিশ্চিতভাবে সফলকাম হবেন । কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা থাকে যা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তোলে এজন্য ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিকল্প কার্যধারা চিহ্নিতকরণ ও বিকল্পসমূহ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহীগণ বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণাত্মক ও বর্ণনামূলক কৌশল প্রয়োগ করেন ।

Table of Contents

সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল বা তত্ত্ব

 

সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল বা তত্ত্ব | সিদ্ধান্ত গ্রহণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে গৃহীত কৌশলগুলোকে নিম্নোক্ত দু’টি প্রধান গ্রুপে বিভক্ত করা যায় : 

ক) কার্যকর সিদ্ধান্তের সংখ্যাত্মক কৌশল (Quantitative tools for effective decision making)

ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজতর, নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল করার জন্য সিদ্ধান্তগ্রহণকারী অনেকগুলো সংখ্যাত্মক কৌশল ব্যবহার করতে পারে । বিশেষ করে উৎপাদন পরিকল্পনা, মজুদ পণ্যের পর্যায় বিশ্লেষণ ও বাজেট প্রণয়নে এসব সিদ্ধান্ত কৌশল বিশেষভাবে অবদান রাখে । সাধারণত সংখ্যাত্মক কৌশল নির্বাহীকে বিকল্পসমূহ গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নে সহায়তা দেয় এবং ঝুঁকির প্রাক্কলন ও অনিশ্চয়তা প্রশমনে সাহায্য করে । প্রধান প্রধান সংখ্যাত্মক সিদ্ধান্ত কৌশল হলো নিম্নরূপ :

 

১. পে-অফ মেট্রিক্স (Pay of matrix) :

পে-অফ মেট্রিক্স (যা সিদ্ধান্ত মেট্রিক্‌স নামেও পরিচিত) ব্যবস্থাপককে দুই বা ততোধিক বিকল্প থেকে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা দেয়। পে-অফ মেট্রিক্সের নিম্নোক্ত পদক্ষেপ থেকে ব্যবস্থাপকগণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে অবগত হন :

ক) সম্ভাব্য বিকল্পসমূহ ও ভবিষ্যৎ অবস্থা (State of nature) চিহ্নিতকরণ;

খ) প্রতিটি অবস্থা ঘটার সম্ভাবনা (Probability) নির্ণয়; 

গ) প্রতিটি বিকল্পের মূল্য বা পে-অফ (Pay off) নির্ণয়; ও

ঘ) প্রতিটি বিকল্পের প্রত্যাশিত মূল্য (Expected value) নির্ণয় ।

সবগুলো বিকল্পের প্রত্যাশিত মূল্য তুলনা করে নির্ধারিত আদর্শের আলোকে সর্বোত্তম বিকল্পটি নির্বাচন করা হয় । 

 

২.সিদ্ধান্ত বৃক্ষ (Decision tree) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণের লৈখিক পদ্ধতি হলো সিদ্ধান্ত বৃক্ষ (Decision tree)। এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক কৌশল যার দ্বারা কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রাপ্তব্য বিকল্প পন্থাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাবনা ও পে-অফসহ যৌক্তিক ফলাফল লেখচিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয় 123 পে-অফ মেট্রিকসে প্রদর্শিত প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত বৃক্ষে প্রদর্শন করা যায় ।

তবে একটি সিদ্ধান্ত থেকে যদি ভবিষ্যতে সিদ্ধান্তের সিরিজ বা ধারাবাহিক অনুক্রম সৃষ্টি হয় তখন পে-অফ মেট্রিকসের চেয়ে সিদ্ধান্ত-বৃক্ষ অধিক উপযোগী কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয় । সিদ্ধান্ত বৃক্ষের শাখাগুলো দ্বারা বিকল্প কার্যধারা নির্দেশ করা হয় এবং শাখাসমূহ যে বিন্দু থেকে বের হয় তা দ্বারা সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয় । 

 

৩.সাইমুলেশন মডেল (Simulation model) :

কোনো একটি সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির বিভিন্ন উপকরণে এবং পরিস্থিতির ফলাফল কী হবে তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক সকল তথ্য কম্পিউটারে ইনপুট ডাটা হিসেবে ব্যবস্থাপকগণ  বিবিধ  নির্দেশ সম্বলিত গাণিতিক মডেল হলো সাইমুলেশন মডেল। 

 

৪. সরলরৈখিক কার্যক্রম (Linear programming) :

কোনো স্বাভাবিক কার্যধারা (function) এর অধীন চলকের সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ মান নির্ণয়ের গাণিতিক কৌশল হলো সরলরৈখিক কার্যক্রম । স্বাধীন চলকের সম্ভাব মানগুলোকে বিবেচনা করে ব্যবস্থাপকগণ তাদের সীমিত সম্পদের বণ্টনকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে পারেন যা থেকে কাম্য ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয় । উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিভিন্ন অবস্থানে বিদ্যমান কারখানা ও গুদামঘরের মধ্যে উৎপাদিত পণ্য বণ্টনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ব্যয়সম্পন্ন সমন্বয় (Combination) নির্ণয়ের জন্য সরলরৈখিক কার্যক্রম কৌশল ব্যবহার করা হয় । 

 

৫. খেলা তত্ত্ব (Game theory) :

খেলা তত্ত্ব দ্বারা ব্যবস্থাপকগণ পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে কার্যকর কৌশল (Strategy) নির্ধারণ করতে পারেন। কোনো পরিস্থিতিতে দুই বা ততোধিক প্রতিযোগী বা খেলোয়াড়ের কার্যক্রম পারস্পরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করলে সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম বা কৌশল কিরূপ হবে তা খেলাতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায় ।

 

৬. অপেক্ষমাণ সারিতত্ত্ব (Queuing theory) :

কোনো সিস্টেমের সারিবদ্ধ ইনপুট বিশ্লেষণ কিংবা কোনো সেবাগ্রহণকারী গ্রাহকদের অপেক্ষার সময় ও সমস্যা দূরীকরণে ব্যবহৃত গাণিতিক কৌশল হলো অপেক্ষমাণ সারিতত্ত্ব । অপেক্ষমাণ সারি ও সেবাপ্রদানকারী কাউন্টারের সংখ্যায় ভারসাম্য স্থাপনে এ তত্ত্বটি প্রয়োগ করা হয়। 

 

৭. পূর্বাভাসকরণ (Forecasting) :

পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি কৌশল হলো পূর্বাভাসকরণ। ভবিষ্যতের প্রত্যাশিত মান ও ধারা নির্ণয়ে পূর্বাভাসকরণ কৌশল ব্যবহৃত হয়। কালিন সারি (Time series analysis), চলিষ্ণুগড় (Moving average), ধারা প্রক্ষেপণ (Trend projection), বহিঃপ্রক্ষেপ-অন্তঃপ্রক্ষেপ ইত্যাদি কৌশলগুলো পূর্বাভাসকরণে ব্যবহৃত হয় ।

 

৮. সিদ্ধান্ত সমর্থন-সিস্টেম (Decision support system) :

অ-কর্মসূচিভিত্তিক জটিল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক ব্যবস্থাপক কম্পিউটারভিত্তিক সিদ্ধান্ত সমর্থন সিস্টেম ব্যবহার করেন। ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত সমর্থন সিস্টেম প্রণয়ন করা হয় ।

 

৯. ইনভেন্টরি মডেল (Inventory model) :

উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও স্বাভাবিকভাবে সময়মত উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বা বিক্রয় নিশ্চিত করার জন্য কাম্যস্তরে কাঁচামাল, আধা উৎপাদিত পণ্য ও উৎপাদিত পণ্যের মজুদ গড়ার কৌশল হলো ইভেন্টরি মডেল। এক্ষেত্রে মিতব্যয়ী ফরমায়েশ পরিমাণ (Economic order quantity) নির্ণয় করা হয় যাতে মোট ইনভেন্টরি সর্বনিম্ন থাকে এবং কাম্য পরিমাণ পণ্যের ইনভেন্টরি সৃষ্টি করা যায়।

 

 

পল অ্যালেন [ Paul Allen ]

 

 

খ) আচরণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কৌশল (Behavioral decision making techniques) :

সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা বা অন্তরায়সমূহের অধিকাংশগুলো মানবীয় আচরণ সম্পর্কিত। এ কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মীদের আচরণকে প্রভাবিত করে এমন কতকগুলো কৌশলের উদ্ভাবন করা হয়েছে । নিচে প্রধান প্রধান আচরণগত সিদ্ধান্ত কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

 

১. সিদ্ধান্ত সময় নির্ণয় (Decision timing) :

অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো কোনো সিদ্ধান্ত। গ্রহণ করা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকা, এরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা এবং যথোপযুক্ত সময় হলেই সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা । এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধা ও ঝুঁকির সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার সুবিধা ও ঝুঁকির তুলনা করে। সাধারণত সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এ ধরনের কৌশল নিতে হয় । সিদ্ধান্ত

২. বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত অন্তরায় চিহ্নিতকরণ (Realistic decision constraints) :

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে প্রকৃত বাধা বা অন্তরায়গুলো (যেমন-উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভৌত বাধা, আইনগত বাধা, সম্পদের অপ্রতুলতা ) চিহ্নিত এবং চিহ্নিত অন্তরায় বা বাধাগুলোকে বিবেচনায় রেখে সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত পন্থা বিদেশ এরূপ কৌশলের অধীন।

৩. সৃজনশীল চিন্তন (Creative thinking) :

ব্যবস্থাপকীয় সমস্যা সমাধানের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্তের | ধিকাংশই ব্যবস্থাপকের সৃজনীশক্তি থেকে উৎসারিত হয়। তাই ব্যবস্থাপকগণকে প্রণোদনা, স্বতঃস্ফূর্ত ংশগ্রহণ, অভিযোজন ইত্যাদির মাধ্যমে অধস্তনদের সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হয়। B. Brelson & GA Seiner-এর মতে, “Creativity identifies novel solutions. ” 24 অর্থাৎ সৃজনশীলতা উত্তম সমাধানের পন্থা চিহ্নিত করে । 

৪. অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞতা (Experience and expertise ) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণের অতীত অভিজ্ঞতা| ব্যবস্থাপককে সমস্যার সমাধানের দ্রুত পন্থা নির্দেশ করে। ব্যবস্থাপক বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে প্রতিটি সমস্যার মুখ্য বিষয়গুলো সহজেই চিহ্নিত করতে পারে এবং আরো সঠিকতার সঙ্গে বিকল্পসমূহ মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়।। কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত ব্যবহারিক জ্ঞান ব্যবস্থাপকের বিশেষজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে । 

 

সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল বা তত্ত্ব | সিদ্ধান্ত গ্রহণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৫. স্বতঃপ্রবৃত্ত জ্ঞান (Intuition) :

স্বতঃপ্রবৃত্ত জ্ঞান নির্বাহীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নৈপুণ্য বৃদ্ধি করে। বুদ্ধিমত্তা, বিচার ক্ষমতা এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে নির্বাহীর স্বতঃপ্রবৃত্ত জ্ঞানকে পরিপকৃতা দেয় । তাই ব্যবস্থাপককে গভীরভাবে প্রতিটি ঘটনা অবলোকন করে বিশ্লেষণাত্মক কার্যকারণ নির্ণয় করতে হয় ।

উল্লিখিত আচরণগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কৌশল ছাড়াও আরো কতিপয় দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কৌশল প্রয়োগ করতে দেখা যায়। মস্তিষ্ক আলোড়ন (Brain storming), আন্তঃক্রিয়াশীল দল (Interacting group), নামিক দল (Nominal group), ডেলফি কৌশল (Delphi technique) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কৌশল । সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কার্যকর ও সাফল্যজনক করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে উভয়বিধ কৌশল থেকে পরিস্থিতির উপযোগী কৌশলটি নির্বাচন করতে হয়। প্রয়োজনে একাধিক কৌশলের সমন্বয়ে ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপন্থা নির্বাচন করার প্রয়োজন পড়ে ।

Leave a Comment