সংগঠন প্রক্রিয়ায় উপাদান বা পদক্ষেপসমূহ

সংগঠন প্রক্রিয়ায় উপাদান বা পদক্ষেপসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের “ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। সংগঠন হলো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মানবীয় ও বস্তুগত উপকরণাদিকে সংহত ও সঠিকভাবে কাজে লাগানোর একটি প্রক্রিয়া। I. A. Allen বলেছেন, ‘সংগঠন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য আবশ্যকীয় কার্যাদি শনাক্তকরণ ও শ্রেণীবদ্ধকরণ, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সংজ্ঞায়িতকরণ ও বন্টন এবং কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত ।”

সংগঠন প্রক্রিয়ায় উপাদান বা পদক্ষেপসমূহ

 

Griffin সংগঠনের উপাদানকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করেছেন : 

১. কার্যাদি শনাক্তকরণ (Designing jobs ) ; 

২. কার্য বিভাগীয়করণ (Grouping jobs) ;

৩. যোগাযোগ সম্পর্ক নিরূপণ (Establishing reporting relationships);

৪. কর্তৃত্ব বণ্টন (Distributing authority) ও

৫. কার্যাদির সমন্বয় সাধন (Co-ordinating activities)।

উপরোক্ত দু’জন লেখকের মতামত বিশ্লেষণ করলে সংগঠন প্রক্রিয়ার যে সকল পদক্ষেপ লক্ষণীয় তা নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হলো :

 

সংগঠন প্রক্রিয়ায় উপাদান বা পদক্ষেপসমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :

১. কার্যাদি শনাক্তকরণ (Identifying or designing jobs) :

সংগঠন প্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কী কী কাজ সম্পাদন করতে হবে তা নির্দিষ্ট করা Bartol ও Martin বলেন, “Job design, the specification of task activities associated with a particular job. –  অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজের নির্দিষ্টকরণই হলো কার্যাদি শনাক্তকরণ। কোনে উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন করতে গিয়ে এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কী কী কাজ করতে হবে তা নির্দিষ্টকরণই। কার্যাদি সনাক্তকরণ হিসেবে বিবেচিত ।

 

২. কার্য বিভাগীয়করণ (Departmentation of jobs ) :

সংগঠন প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলে কার্যাদি সঠিকভাবে সনাক্ত বা নির্দিষ্ট করে তা প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা। Newman বলেন, “Departmentation is the process of grouping activities into units for purposes of administration.” অর্থাৎ প্রশাসনের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কার্যসমূহকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করার প্রক্রিয়াই হলো বিভাগীয়করণ । কাজ সঠিকভাবে চিহ্নিত ও ভাগ করা না হলে উপযুক্ত কর্মীসংস্থান ও দায়িত্ব অর্পণ সম্ভব হয় না।

ধরা যাক, সজীবকে একটি ক্লাব সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাহলে সজীবের প্রথম কাজ হবে ক্লাবের উদ্দেশ্য বুঝে কী কী কাজ করতে হবে তা নির্দিষ্টপূর্বক কাজগুলোকে প্রধান প্রধান কতকগুলো ভাগে ভাগ করা; যেমন -অফিস বিভাগ, ক্রীড়া বিভাগ, সংস্কৃতি বিভাগ ইত্যাদি ।

 

৩. দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সংজ্ঞায়িতকরণ (Defining authority and responsibility) :

কাজ ভাগ করার পর সংগঠন প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রত্যেক কাজের জন্য দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সীমারেখা নির্দিষ্ট করা । উৎপাদন বিভাগ এবং ক্রয় বিভাগ পাশাপাশি থাকলে যদি প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব ঠিক করে দেয়া না হয় তবে কার্যক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হবে । উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন বিভাগ না ক্রয় বিভাগ সংগ্রহ করবে তা বলা না থাকলে উভয় বিভাগের মধ্যে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে যেতে পারে । প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্ব-কর্তৃত্বের আলোকেই কোথায়, কী মানের উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করতে হবে তাও নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

 

৪. উপায়-উপকরণ সংগ্রহ (Procuring resources) :

প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অনুযায়ী যথাযথ কার্যবিন্যাস এবং বিভাগ-উপবিভাগ খোলার পর প্রত্যেক বিভাগের কাজ ও দায়-দায়িত্ব বিবেচনায় মানবীয় ও বস্তুগত উপকরণ সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে। ধরা যাক, একটা অফিস বিভাগ খোলার প্রয়োজন । অফিসকে সঠিকভাবে চালাতে গেলে কী পরিমাণ ও কী মানের জনশক্তির প্রয়োজন হবে, কি ধরনের আসবাবপত্রের প্রয়োজন পড়বে, যন্ত্রপাতি কি লাগবে ইত্যাদি নির্ধারণ ও তা সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। এগুলো সঠিক মানে সংগ্রহ করতে পারার ওপর প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজের সফলতা নির্ভর করে ।

 

৫. দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব অর্পণ (Delegation of authority and responsibility) :

দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সীমারেখা নিরূপণের পর সংগঠন প্রক্রিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ হলো প্রত্যেক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, বিভাগ বা উপবিভাগকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব বুঝিয়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সব সময়ই সমান হওয়া উচিত । প্রত্যেক ব্যক্তি, বিভাগ ও উপবিভাগের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া গেলে সে অনুযায়ী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। দায়িত্বের তুলনায় কর্তৃত্ব বেশি হলে নির্বাহী স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়তে পারে। আবার কর্তৃত্ব কম হলে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না ।

 

৬. পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ (Determining interpersonal relationship) :

সংগঠন প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ হলো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ, উপবিভাগ ও ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা। এক্ষেত্রে কে কার ঊর্ধ্বতন এবং কে কার অধস্তন তা ঠিক করা হয় । এক্ষেত্রে যাতে কখনই দ্বৈত অধীনতার সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন । এভাবে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ফলে ওপর হতে নিচ পর্যন্ত একটি ‘চেইন অব কমান্ড’ গড়ে ওঠে। এর ফলে যেকোনো আদেশ-নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় ।

 

ব্যবস্থাপনা পরিচিতির ভূমিকা | ব্যবস্থাপনার পরিচিতি | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

উপরোক্ত পদক্ষেপসমূহ ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে কার্যকর সংগঠন গড়ে তোলা হয় । সংগঠন কাঠামো মজবুত ও শক্তিশালী হলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও উপায়-উপকরণের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হয়ে থাকে । অন্যথায় কার্যক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয় । যা পরবর্তী সময়ে সংশোধন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়সাধ্য হয়ে থাকে ।

Leave a Comment