সংগঠন কাঠামোর শ্রেণিবিভাগ

সংগঠন কাঠামোর শ্রেণিবিভাগ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন” বিষয়ক পাঠের অংশ। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ, উপবিভাগ ও কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো চিত্রকেই সংগঠন কাঠামো বলে । একটা প্রতিষ্ঠানে নানান বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের সংগঠন কাঠামো লক্ষ করা যায়। নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে তা প্রদর্শিত হলো :

 

সংগঠন কাঠামোর শ্রেণিবিভাগ | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

সংগঠন কাঠামোর শ্রেণিবিভাগ

উপরের রেখাচিত্রে প্রদর্শিত বিভিন্ন ধরনের সংগঠন কাঠামো নিম্নে আলোচনা করা হলো :

i) আনুষ্ঠানিকতার বিচারে (On the basis of formalities) :

ক) আনুষ্ঠানিক সংগঠন (Formal organisation) :

প্রাতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে যে সাংগঠনিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে আনুষ্ঠানিক সংগঠন বলে । এরূপ সংগঠনে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন পদ, প্রত্যেক পদে সম্পাদিত কাজ, দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নির্দিষ্ট করা হয় ।

এ ছাড়া ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কে কার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত থাকবে বা কার কাছ থেকে আদেশ লাভ করবে ও কাজের জন্য কার নিকট জবাবদিহি করবে তা পূর্ব হতেই নির্দিষ্ট থাকে। রেখাচিত্রে বিভাজন যেভাবেই করা হোক না কেন সংগঠন কাঠামোর শ্রেণীবিভাগ বলতে মূলত আনুষ্ঠানিক সংগঠনের শ্রেণীবিভাগকেই বুঝানো হয় । এরূপ সংগঠন কাঠামো নিম্নোক্ত ধরনের হয়ে থাকে :

১. সরলরৈখিক সংগঠন (Line organization) :

যে সংগঠন পদ্ধতিতে ক্ষমতা বা কর্তৃত্বরেখা ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ স্তর হতে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে সরল রেখার আকারে নেমে আসে তাকে সরলরৈখিক সংগঠন বলে। সামরিক সংগঠনে আদেশদানের সরলরৈখিক গতিরেখার প্রতি যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় এক্ষেত্রে অনুরূপ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় বলে একে সামরিক সংগঠনও বলা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক অধস্তন তার অব্যবহিত ঊর্ধ্বতনের নিকট তার কাজের জন্য সর্বোতভাবে দায়ী থাকে । সাধারণত জটিলতামুক্ত ও ছোট আয়তনবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এরূপ সংগঠন কাঠামো অধিক ব্যবহৃত হয়।

২. সরলরৈখিক ও পদস্থ কর্মী সংগঠন (Line and staff organization) :

যে সংগঠন কাঠামোতে সরলরৈখিক নির্বাহীকে সহযোগিতা করার জন্য উপদেষ্টা বা বিশেষজ্ঞ কর্মীর ব্যবহার করা হয় তাকে সরলরৈখিক ও পদস্থ কর্মী সংগঠন বলে । এরূপ সংগঠন কাঠামোতে দু’ধরনের কর্মী থাকে – একদল সরলরৈখিক নির্বাহী ও অন্যদল পদস্থ বা সহযোগী কর্মী । এক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সরলরৈখিক নির্বাহী ভোগ করেন । অপরপক্ষে পদস্থ কর্মীর কাজ হলো সরলরৈখিক নির্বাহীর কাজে সহযোগিতা প্রদান করা । তুলনামূলকভাবে বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন কাঠামো উত্তম ।

৩. কার্যভিত্তিক সংগঠন (Functional organization) :

কার্যভিত্তিক সংগঠন বলতে এমন এক ধরনের সংগঠনকে বুঝায় যাতে ব্যবস্থাপনার কার্যাবলিকে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে এদের এক-একটিকে এক-একজন বিশেষজ্ঞের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এরূপ সংগঠনে বিশেষজ্ঞদেরকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ না করে সরাসরি নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ করা হয়ে থাকে । বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার জনক এফ. ডব্লু. টেলর এ ধরনের সংগঠন কাঠামোর উদ্ভাবক। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি বিভাগ একযোগে একাধিক বিভাগকে সেবা প্রদান করে ।

৪. মেট্রিক্স সংগঠন (Matrix organization) :

ব্যবস্থাপনা সংগঠনের আধুনিক রূপ হলো মেট্রিক্স সংগঠন । এটি হলো মূলত বিভাগীয়করণের একাধিক পদ্ধতির মিশ্র রূপ । দ্রব্য ও কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ ও ক্ষেত্রবিশেষে অঞ্চলভিত্তিক বিভাগীয়করণের সমন্বয়ে দ্বৈত কর্তৃত্ব সম্বলিত যে সংগঠন কাঠামো বর্তমানকালে গড়ে তোলা হয় তাকেই মেট্রিক্স সংগঠন বলে। এক্ষেত্রে কার্যিক ব্যবস্থাপক ও প্রজেক্ট ব্যবস্থাপক পাশাপাশি কর্মরত থাকে এবং যার যার কাজের জন্য ঊর্ধ্বতনের নিকট দায়ী হয় । বর্তমানকালে উন্নতমানের কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কাজের জটিলতা ও বিস্তৃতি বাড়ায় বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেট্রিক্স সংগঠন সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

৫. কমিটি সংগঠন (Committee organization) :

কমিটি হলো এক দল লোকের সমষ্টি যাদের ওপর বিশেষভাবে কোন নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কার্য সমাধা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় । এরূপ কমিটি প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে গঠন করা যেতে পারে। তবে সাধারণত সরলরৈখিক বা সরলরৈখিক ও পদস্থ কর্মী সংগঠনে বিশেষ ক্ষেত্রে বা বিশেষ প্রয়োজনে এ ধরনের সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও ব্যবহার করা হয় । প্রতিষ্ঠানে সমন্বয় কমিটি, শৃঙ্খলা কমিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কমিটি, পরীক্ষা কমিটি ইত্যাদি এরূপ সংগঠনের উদাহরণ ।

 

খ) অনানুষ্ঠানিক সংগঠন (Informal organization) :

কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে সাংগঠনিক নিয়মে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও এর দ্বারা ব্যক্তির সকল চাওয়া-পাওয়ার সবটা পূরণ সম্ভব হয় না । তাই একই স্থানে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরেও ব্যক্তিগত মিল-মহব্বত, পারস্পরিক স্বার্থ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, আঞ্চলিক ইত্যাদি কারণে নিকট সম্পর্ক গড়ে ওঠে । এরূপ সম্পর্ক হতে যে দল গড়ে ওঠে তাকে অনানুষ্ঠানিক দল (Informal group) এবং এই দলকে অনানুষ্ঠানিক সংগঠন বলে ।

ii) সংগঠন চিত্রের ধরন বিচার (On the basis of organization chart) :

ক) সমান্তরাল সংগঠন (Flat organization):

যে আনুষ্ঠানিক সংগঠন কাঠামোতে অধস্তন কর্মীর সংখ্যা বেশি হলেও সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা কম হয় এবং চিত্র অনেকটা সমান্তরাল রূপ পরিগ্রহ করে তাকে সমান্তরাল সংগঠন বলে। Bartol ও Martin এর মতে, “A flat structure that has few hierarchical levels and wide spans of control.”15 অর্থাৎ কম সংখ্যক সাংগঠনিক স্তর এবং প্রশস্ত নিয়ন্ত্রণ পরিসরযুক্ত কাঠামো হলো সমান্তরাল কাঠামো। এরূপ সংগঠন কাঠামোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি নিচের দিকে বিস্তৃত না হয়ে পাশাপাশি বেশি বিস্তৃতি লাভ করে ।

খ) খাড়াকৃতির সংগঠন (Tall organization) :

যে আনুষ্ঠানিক সংগঠন কাঠামোতে সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা বেশি হয় এবং একজন নির্বাহী কম সংখ্যক অধস্তন তত্ত্বাবধান করে তাকে খাড়াকৃতির সংগঠন বলে । Bartol ও Martin এর মতে, “A tall structure is one that has many hierarchical levels and narrow spans of control. “16 অর্থাৎ খাড়াকৃতির সংগঠন হলো এমন যেখানে সাংগঠনিক স্তরের সংখ্যা বেশি থাকে এবং নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণ পরিসর ছোট হয় । এরূপ সংগঠন কাঠামোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পাশাপাশি বেশি বিস্তৃত না হয়ে নিচের দিকে বেশি বিস্তৃত হয় ।

iii) নমনীয়তার দিক বিচার (On the basis of flexibility) :

ক) ধ্রুব বা স্থির সংগঠন (Machanistic organization) :

স্থির কর্মপরিবেশ বিবেচনায় যে সংগঠন কাঠামো দাঁড় করানো হয় তাকে ধ্রুব বা স্থির সংগঠন কাঠামো বলে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সংগঠন কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হতে পারে- এ চিন্তা কার্যকর থাকে না। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এ ধরনের সংগঠন কাঠামো গড়ে তোলা হয়। স্থায়ী পরিকল্পনার আলোকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এমন প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামো এ ধরনের হয়ে থাকে ।

 

সংগঠন কাঠামোর শ্রেণিবিভাগ | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

 

খ) আপেক্ষিক বা অরগাণিক সংগঠন (Organic organization) :

পরিবর্তিত কর্ম পরিবেশ বিবেচনায় পরিবর্তন হতে পারে ধরে নিয়ে সংগঠন কাঠামো সাজানো হলে তাকে অরগাণিক সংগঠন বলে। ফরমায়েশভিত্তিক, মৌসুমী বা প্রজেক্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন কাঠামো ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে জনশক্তির নিয়োগ থাকে মূলত চুক্তিভিত্তিক। যে কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় সবসময়ই সংগঠন কাঠামোতে পরিবর্তন আনা যায় ।

Leave a Comment