আজকের আলোচনার বিযয় কমিটির সুবিধা বা কমিটির ব্যাপক ব্যবহারের কারণ – যা সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন এর অর্ন্তভুক্ত, বর্তমানকালে যেকোনো ধরনের বড় প্রতিষ্ঠানে কমিটি একটি অতি পরিচিত নাম ও বহুল ব্যবহৃত বিষয়।
Table of Contents
কমিটির সুবিধা বা কমিটির ব্যাপক ব্যবহারের কারণ

অনেকেই অনেকভাবে কমিটিকে সমালোচনা করলেও দিন দিন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমিটির ব্যবহার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতেই এর প্রয়োজন ও উপযোগিতার বিষয়টি ধরা পড়ে। এর প্রতি আলোকপাত করে অইরিক ও কুঞ্জ বলেছেন, “Committees are a fact of organizational life. ” অর্থাৎ কমিটি হলো সাংগঠনিক জীবনের নিরেট বাস্তবতা । নিম্নে কমিটি ব্যবহারের সুবিধা বা যে সকল কারণে এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয় তা তুলে ধরা হলো:
১. দলবদ্ধ বিবেচনার সুযোগ (Opportunity of group judgement) :
প্রবাদে আছে, “Two heads are better than one.” অর্থাৎ দুটো মাথা একটা মাথার চেয়ে উত্তম । একক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেয় তখন ব্যক্তিক চিন্তা, তথ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেচনা শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে কিছুটা ভুল-ত্রুটি থেকে যাওয়া অসম্ভব নয় ।
কিন্তু যখন একাধিক ব্যক্তির কোনো কমিটি ঐ বিষয়ে একত্রে চিন্তা-ভাবনা করে তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলের সম্মিলিত চিন্তা, তথ্য, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি যোগ হওয়ায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ ও সম্ভব হয় । R. M. Hodgetts এ সম্পর্কেই বলেছেন, “A committee has more knowledge, experience and judgement than any one individual alone.” অর্থাৎ কমিটির জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিচার-বিবেচনা স্বভাবতই একক ব্যক্তির চেয়ে উত্তম ।
২. সমন্বয়সাধনে সহায়তা (Assisting co-ordination) :
বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগের কাজকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সমন্বয়সাধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর দায়িত্ব সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন নির্বাহীগণ পালন করেন। কিন্তু তাদের কাজের চাপ অনেক সময়ই বেশি থাকে ।
এ ছাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি কোনো নির্দেশ দান বা চাপ সৃষ্টির বিষয় নয় বিধায় এক্ষেত্রে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য বিবেচিত হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সমন্বয়ে কমিটি সবচেয়ে কার্যকর বিবেচিত হয়। বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে এর বিভিন্ন বিভাগের কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এরূপ কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।
৩. স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের প্রতিনিধিত্ব (Representation of interseted group) :
প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে নির্বাহী কর্তৃক একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাধারণ নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর বিবেচিত হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি নির্ধারণ ও আলাপ-আলোচনা করলে তা অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বশীল ও ফলদায়ক হয় ।
কমিটিতে যেহেতু বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় তাই এতে গৃহীত সিদ্ধান্তে সকল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায় । ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হয়। কমিটি ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে এরূপ স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকে না বিধায় বড় প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এ ধরনের কমিটি গঠন করতে দেখা যায় ।
৪. তথ্য ও ভাবের বিনিময় (Interchanging ideas and information) :
তথ্য ও ভাবের বিনিময়ের ক্ষেত্রেও কমিটি অত্যন্ত কার্যকর সহযোগিতা প্রদান করে । অইরিক ও কুঞ্জ এ সম্পর্কেই বলেছেন, “Committees are useful for transmitting and sharing information. “39 কমিটির সভায় সমবেত সদস্যগণ তাদের বিভাগীয় তথ্য, অবস্থা, সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে তা অন্যের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে পারে । কমিটি কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত যেমনি এর সকল সদস্য একই সঙ্গে একইভাবে বুঝে নিতে পারে তেমনি উর্ধ্বতন নির্বাহী কর্তৃক বাস্তবায়ন কমিটির কাছে পেশকৃত সিদ্ধান্ত সকলে একই সঙ্গে জানার সুযোগ পায়। এতে গৃহীত সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হয় ।
৫. সহযোগিতার উন্নয়ন (Promotion of co-operation) :
প্রতিষ্ঠানে দলবদ্ধ প্রচেষ্টা (Team spirit) জোরদারের ক্ষেত্রে সহযোগিতার উন্নয়ন অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ওপর হতে নিচ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ে চিন্তার ঐক্য ও দলীয় সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় । অথচ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব সাধারণত প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কতিপয় ব্যক্তির হাতে থাকে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও বাস্তবায়নকারী পক্ষের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
এক্ষেত্রে উর্ধ্বতন ও অধস্তনদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটি যখন কাজ করে তখন সেখানে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ঊর্ধ্বতন যেমনি নিচের দিকের বাস্তব অবস্থা ও সমস্যা বুঝতে পারে তেমনি অধস্তন নির্বাহীগণও ঊর্ধ্বতনদের চাওয়া-পাওয়া ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পায়। এতে ওপর ও নিচের মধ্যে সহযোগিতার উন্নয়ন ঘটে ।
৬. গণতান্ত্রিক মনোভাবের বিকাশ (Development of democratic attitude) :
কমিটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতনদের মাঝে গণতান্ত্রিক মনোভাবের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কমিটিতে যারা সদস্য হন সবাই সেখানে সমান অধিকার ভোগ করেন । কমিটির মিটিং এ বসে ঊর্ধ্বতনের সামনে সকল বিষয় যেভাবে বলা যায় অন্যত্র তা বলা হলে অনেক সময়ই তা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। ‘One head one vote ‘ এ নীতি সেখানে কার্যকর থাকে ।
‘Majority must be granted’- এ নীতির কারণে ঊর্ধ্বতন নির্বাহী চাইলেও তার মত চাপিয়ে দিতে পারে না। ফলে সবার মাঝে অন্যের মতামত শোনার, অন্যের সঙ্গে নিজ মতের সমন্বয় বিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের মন-মানসিকতার উন্নয়ন ঘটে। ঊর্ধ্বতনকে স্বৈরাচারী করে ।
৭. একক কর্তৃত্বের ভীতি হ্রাস (Lessening the fear of single authority):
একক কর্তৃত্ব অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। ঊর্ধ্বতন যাতে এভাবে একক কর্তৃত্বের কারণে স্বৈরাচারী হয়ে পড়তে না পারে সেজন্য প্রতিষ্ঠানে কিছু কিছু কর্তৃত্ব বিভিন্ন কমিটির ওপর অর্পণ করে ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য স্থাপন করা হয় । দেশের সংবিধানেও ‘Balance of power’ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে । প্রতিষ্ঠানে আর্থিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ফিন্যান্স কমিটি, ক্রয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্রয় কমিটি ইত্যাদি গঠন করা হয় । এ ছাড়া অনেক সময় একক ব্যক্তি কর্তৃক সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তার যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। কমিটি গঠনের মাধ্যমে এরূপ সমস্যাও দূর করা যায় ।
৮. প্রণোদনা সৃষ্টি (Creating inspiration) :
কমিটির সদস্যপদ ব্যক্তির মাঝে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । যে ক্ষেত্রে কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে সেখানে কমিটি সকল পক্ষের সন্তুষ্টিরও কারণ হয় । কমিটির মাধ্যমে যে পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তার বাস্তবায়নকে -এর প্রতিটা সদস্য এবং তাদের অনুসারীরা নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে ।
ফলে সিদ্ধান্তের ভাবমূর্তিই শুধু বাড়ে না এর বাস্তবায়নও সহজ হয় । অধ্যাপক নিউম্যান এ সম্পর্কেই বলেছেন, ‘When an individual has even a small part in formulating a plan, he is much more interested in seeing that it is properly executed’,40 অর্থাৎ যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণে ব্যক্তির সামান্য অংশীদারিত্ব থাকে তখন সে ঐ পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন দেখার জন্য উৎসুক হয় ।
৯. সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও চিন্তাধারার বিকাশ ( Providing training for members and improving their thinking) :
কমিটি প্রশিক্ষণ দানের একটি অন্যতম উপায় হিসেবে বর্তমানকালে বিবেচিত । কমিটিতে জুনিয়র যে সকল সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয় তারা কমিটির সভায় সিনিয়র সদস্য ও ঊর্ধ্বতনের সাহচর্য লাভের সুযোগ পায় । সিনিয়র সদস্যদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তারা যেমনি অনেক কিছু শিখতে পারে তেমনি বিভিন্ন আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে জানতে পারে ।
এতে তাদের চিন্তাধারার উন্নয়ন ঘটে এবং উন্নততর দায়িত্ব পালনের সাহস জন্মে । এজন্য কমিটিগুলোতে নতুন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার একটি নিয়ম লক্ষ করা যায় । পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির পরিচালকমণ্ডলীতে প্রতি বছর এক- তৃতীয়াংশ সদস্যের অবসর গ্রহণের রীতি, মার্কিন সিনেটে একত্রে এক-তৃতীয়ংশ নতুন সদস্য নির্বাচনের রীতি এর উদাহরণ ।

১০. ব্যক্তিগত দায় ও অবাঞ্ছিত সমস্যা এড়ানো (Avoidance of personal liabilities & undesirable problems) :
কমিটির আরেকটি বড়ো উপযোগিতা হলো এর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায় এড়িয়ে যেতে পারেন। একজন যোগ্য প্রশাসক স্বাধীনমতো কমিটি গঠন করে নিজ সিদ্ধান্তকে কমিটির সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রয়োগ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় এমন পরিস্থিতিরও উদ্ভব হয় যেখানে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না আবার সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় না ।
সেখানে ঊর্ধ্বতন কমিটি গঠন করে সহজেই এ অবাঞ্ছিত অবস্থা এড়িয়ে যেতে পারেন । অইরিক ও কুঞ্জ এ সম্পর্কেই বলেন, “One of the surest way to delay the handling of a problem and even to postpone a decision indefinitely, is to appoint a committee to study the matter. ” অর্থাৎ কোনো সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিষয়টি বিলম্বিত করা কিংবা একটি সিদ্ধান্তকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার নিশ্চিততম পন্থা হলো বিষয়টিকে কোনো কমিটির ওপর ন্যস্ত করা ।
উপরোক্ত সুবিধাবলির কারণে বর্তমান বৃহদায়তন সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে । Harvard Business Review পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানে কমিটি ব্যবহারের প্রয়োজন কতটুকু R.Tillman এ মর্মে জরিপ চালিয়ে দেখতে পেয়েছেন, “Only 8 percent of the respondents indicated that they would eliminate committees if it were within their উত্তরদাতাই প্রতিষ্ঠানে কমিটির ব্যবহার অনুমোদন করেছেন ।
