আজকের আলোচনার বিযয় কর্তৃত্বার্পণের আবশ্যকতা বা গুরুত্ব – যা কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণ এর অর্ন্তভুক্ত, বর্তমানকালে কাজের বিস্তৃতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে প্রতিষ্ঠানের সকল কাজ নিজ হাতে করা সম্ভব নয় । এরূপ অসম্ভাব্যতার কারণেই কোনো ব্যক্তির পক্ষে সকল কর্তৃত্ব নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখাও সম্ভব হয় না । সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনের জন্যই তার কর্তৃত্ব অধস্তনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হয়।
Table of Contents
কর্তৃত্বার্পণের আবশ্যকতা বা গুরুত্ব

লাউন্ডসব্যুরি ফিস (Loundsbury Fish) এ সম্পর্কেই বলেছেন, “একজন ব্যক্তি শুধু একটি মনুষ্য শক্তির অধিকারী, এক হাতের মালিক, সে শুধু এতটুকু সম্পাদন করতে পারে যতটুকু তার এক হাতের পক্ষে করা সম্ভব। শুধুমাত্র কর্তৃত্বার্পণের মাধ্যমেই নিজ দায়িত্ব অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে তিনি অধিক কার্য সম্পাদন করতে পারেন।” নিম্নে কর্তৃত্বার্পণের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো :
১. নির্বাহীর কর্মভার লাঘব (Reducing workload of executive) :
কর্তৃত্বার্পণ একজন নির্বাহীর কর্মভার লাঘব করে তাকে দক্ষতার সঙ্গে কার্য সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করে। এর মাধ্যমে নির্বাহী তার কাজের অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ কাজ অধস্তনের কাছে অর্পণ করে নিজে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে । অবশ্য কর্তৃত্ব অর্পণ করা হলেও মূল কর্তৃত্ব নির্বাহীর হাতেই থেকে যায়। ফলে কৰ্তৃত্ব হস্তান্তরিত হলেও কর্তৃত্ব হারানোর ভয় নির্বাহীর থাকে না বিধায় তিনি কার্যক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ।
২. ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন (Management development ) :
কর্তৃত্বার্পণের কারণে ঊর্ধ্বতন কাজের কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অংশবিশেষ অধস্তনদের ওপর অর্পণ করে নিজ কাজে যেমনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তেমনি অধস্তন নির্বাহীগণও কর্তৃত্ব ভোগ করায় অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ পায় । এতে সার্বিকভাবে ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন ঘটে। এজন্য ট্রিওয়াথা ও নিউপোর্ট বলেন, “When delegation takes place the superior also spends less time on specific technical activities and places greater emphasis on being a manager.”19 অর্থাৎ কর্তৃত্বার্পণের দরুন ঊর্ধ্বতনেরা কারিগরি কার্যক্রমে তুলনামূলকভাবে কম সময় ব্যয় করেন এবং যথার্থই ব্যবস্থাপক হওয়ার ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগী হতে পারেন ।
৩. অধস্তনদের মর্যাদা বৃদ্ধি (Increasing status of subordinates) :
প্রতিষ্ঠানের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত কর্তৃত্বরেখা ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয় । ফলে উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরের নির্বাহী পর্যন্ত প্রত্যেকেই কিছু না কিছু কর্তৃত্ব ভোগ করে এবং যার বলে সে তার অধস্তনের ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে । ফলে অধস্তনরা তার আদেশ মানতে বাধ্য থাকে । এতে অধস্তন নির্বাহীদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় ।
৪. প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি (Creation of training facilities) :
কর্তৃত্বাপণের ফলে অধস্তনরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পায় । এ ছাড়াও অব্যবহিত অধস্তনের ওপর তারা কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ লাভ করে । এর ফলে অধস্তনরা প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে নিজেদের মানোন্নয়ন ঘটাতে পারে । অন্যদিকে ঊর্ধ্বতনও কর্তৃত্বাপণের পর অধস্তনদের কাছে থেকে কাজ আদায়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেন ।
৫. কার্যপরিধি সম্প্রসারণ (Expansion of scope of activities) :
বর্তমানকালে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থেই প্রতিনিয়ত ব্যবসায় সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দেয় । অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজই বিভিন্ন অঞ্চলে এমন কী দেশ-বিদেশে সম্প্রসারিত হয়ে থাকে । যথাযথ কর্তৃত্বাপণ ছাড়া এরূপ কার্য সম্প্রসারণ কোনোভাবেই সম্ভব নয় ।
৬. মনোবল উন্নয়ন (Boosting the morale) :
কর্তৃত্বাপণের ফলে অধস্তনদের মান-মর্যাদা যেমনি বাড়ে তেমনি তাদের মনোবলও এতে উন্নত হয়। প্রতিষ্ঠানের উপরিস্তর থেকে কর্তৃত্ব-রেখা যতোই নিচের দিকে প্রবাহিত হয় অধস্তন নির্বাহীদের মনোবলও ততোই বৃদ্ধি পায়। এতে অধস্তনরা কার্যক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেয় এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায় ।

৭. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা (Establishing organizational discipline) :
কর্তৃত্বার্পণ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক কার্যধারা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কর্তৃত্বাপণের ফলে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে অধস্তনের একটি বাধ্য-বাধকতা ও জবাবদিহিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় । এভাবে কর্তৃত্বরেখা নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় ।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কর্তৃত্বার্পণ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাদি সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয় । এ কারণেই ছোট-বড় সকল প্রতিষ্ঠানেই অধস্তনের কাছে প্রয়োজনীয় কর্তৃত্বার্পণ করা হয় । অবশ্য কর্তৃত্বার্পণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে হিতে-বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ।
