আজকের আলোচনার বিযয় কর্তৃত্বার্পণের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা – যা কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণ এর অর্ন্তভুক্ত, কর্তৃত্বাপণ ছোট-বড় সকল প্রতিষ্ঠানে অপরিহার্য বিবেচিত হলেও কর্তৃত্বার্পণে সীমাবদ্ধতা বা অসুবিধার পরিমাণও কম নয় । কর্তৃত্বার্পণে সাধারণ কিছু সীমাবদ্ধতা যেমনি লক্ষ করা যায় তেমনি ঊর্ধ্বতন এবং অধস্তনের দিক থেকেও অসুবিধা পরিলক্ষিত হয় । এরূপ অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতাসমূহ আলোচনা করা হলো :
Table of Contents
কর্তৃত্বার্পণের অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা

ক) সাধারণ সীমাবদ্ধতা (General limitations) :
১. সমন্বয়ে সমস্যা (Problem of co-ordination) :
প্রতিষ্ঠানের উচ্চস্তর থেকে কর্তৃত্বরেখা যতোই নিচের দিকে প্রবাহিত হয় ততোই বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগের সৃষ্টি হয়। কর্তৃত্বাপণের মাত্রা যতই বাড়তে থাকে কাজকে একসূত্রে সমন্বিত করা ততই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায় ।
২. নিয়ন্ত্রণে জটিলতা (Complexity in controlling) :
কর্তৃত্বার্পণের ফলে শুধুমাত্র সমন্বয়েই সমস্যা দেখা দেয় না নিয়ন্ত্রণেও সমস্যা হয়। কর্তৃত্বার্পণ কাজকে সম্প্রসারিত করে ফলে ঊর্ধ্বতনের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের সকল কাজ যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সকল পর্যায়ে দ্রুত বিচ্যুতি নিরূপণ ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেও জটিলতা দেখা দেয় ।
৩. কর্তৃত্বের পরিমাণ নির্ধারণে জটিলতা (Complexity in determing the amount of authority) :
প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে কর্তৃত্বের পরিমাণ কী হবে তা নির্ধারণ করাও বেশ জটিল । কোন্ কর্তৃত্ব কার ওপর অর্পণ করা উচিত ক্ষেত্র বিশেষে এ নিয়েও সংশয় দেখা দেয়। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কোনো কর্তৃত্ব যার বা যে বিভাগের অধীনে থাকার কথা কোনো কারণে ঊর্ধ্বতন ঐ কাজের দায়িত্ব অন্যের ওপর অর্পণ করতে পারে । এতেও জটিলতা দেখা দেয় ।
৪. দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি (Creating opportunity to avoid responsibility) :
কর্তৃত্বার্পণের ফলে দায়-দায়িত্ব হস্তান্তরিত না হলেও ঊর্ধ্বতনের মানবীয় দুর্বলতা ও গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই দায় এড়ানোর অশুভ প্রবণতা তাদের মধ্যে লক্ষ করা যায় । এতে প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধানের অভাব দেখা দেয় । যা কার্যক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে ।
৫. দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকীর্ণতা আরোপ ( Imposing narrowness in outlook) :
কর্তৃত্বার্পণের ফলে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত অধস্তন তার নির্দিষ্ট কাজের জন্য ঊর্ধ্বতনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এতে অধস্তন উক্ত কাজের বাইরে কিছু ভাবতে চায় না । যা তার চিন্তা-ভাবনাকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে । কোনো কারণে কর্তৃত্ব হারালে সে যেমনি আহত হয় তেমনি নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরে কিছু করতেও তার তেমন আগ্রহ থাকে না |
খ) মালিক বা শীর্ষনির্বাহী সৃষ্ট সীমাবদ্ধতা (Limitation created by the proprietor or top)
১. নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা (High idea of myself ) :
অনেক সময়ই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজেকে বড় করে ভাবেন । তিনি নিজকে কর্তৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন । তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড়ো কল্যাণকামী ভাবেন। আর এরূপ মানসিকতার কারণে ঊর্ধ্বতন নিজের কাছেই সকল কর্তৃত্ব সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন । ফলে কর্তৃত্বার্পণ বিঘ্নিত হয় ।
২. অধস্তনের প্রতি আস্থার অভাব (Lack of confidence in subordinates) :
অনেক সময়ই ঊর্ধ্বতন তার অধস্তনদের যোগ্যতা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পোষণে ব্যর্থ হন বা সন্দিহান থাকেন। যে কারণে অধস্তনদের ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারেন না এবং কর্তৃত্বার্পণে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন । এতেও কর্তৃত্বাপণে সমস্যা দেখা দেয় ।
৩. প্রভুত্বব্যঞ্জক মনোভাব (Authoritarian attitude) :
কোনো কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার মধ্যে প্রভুত্বব্যঞ্জক মনোভাব কাজ করে । ফলে তিনি তার কর্তৃত্বে কাউকে ভাগ দিতে চান না । তিনি ভাবেন কর্তৃত্বার্পণের ফলে প্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ক্ষুণ্ন হবে । যা কর্তৃত্বাপণকে বাধাগ্রস্ত করে ।
৪. মানসিক সংকীর্ণতা (Narrowness of mentality) :
কিছু কিছু উর্ধ্বতন রয়েছেন যারা মানসিক সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট। তারা ভাবেন একবার অধস্তন কর্তৃত্বের স্বাদ পেলে তাকে অমান্য করবে বা কর্তৃত্ববলে অধস্তন তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিজের অবস্থান সংহত করবে । ক্ষেত্রবিশেষে ঊর্ধ্বতনের এরূপ সংকীর্ণতা কর্তৃত্বাপণের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় ।
৫. ঝুঁকি গ্রহণে অক্ষমতা (Inability to take risk) :
অনেক ঊর্ধ্বতন রয়েছে যাঁরা কর্তৃত্বার্পণকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন । তারা ভাবেন অধস্তন দায়িত্ব পালনে অনেক ভুল-ত্রুটি করবে এবং সেই সকল কাজের দায়ভার তার ওপর বর্তাবে। এতে তার সম্মানহানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। এরূপ অতি সতর্কতাও কর্তৃত্বাপণে অনেক সময়ই বাধার সৃষ্টি করে ।
৬. তত্ত্বাবধানে অনাগ্রহ (Reluctance towards supervision) :
এমন কিছু নির্বাহী দেখা যায়, যারা অন্যদেরকে পরিচালনার চেয়ে নিজে কাজ করাকেই উত্তম গণ্য করেন । ব্যক্তিগত অযোগ্যতার কারণেও অনেকের মধ্যে তত্ত্বাবধানে অনাগ্রহের সৃষ্টি হয়। আর এরূপ অনাগ্রহ থাকলে তার পক্ষে কর্তৃত্ব হস্তান্তর করা সম্ভব হয় না ।
গ) অধস্তনসৃষ্ট সীমাবদ্ধতা (Limitation created by subordinates) :
১. দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা (Tendency to avoid responsibility) :
কর্তৃত্বের সঙ্গে দায়িত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত । কৰ্তৃত্ব চাইলে দায়িত্ব আপনা-আপনি এসে যায় । কিন্তু অনেক অধস্তন রয়েছে যারা এই দায়িত্বের বোঝা গ্রহণ করতে চায় না । নিজের উন্নয়ন সম্পর্কে উদাসীন অধস্তন সব সময়ই দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে ভালোবাসে । যা কর্তৃত্বাপণকে বাধাগ্রস্ত করে ।
২. পরনির্ভরশীল মনোভাব (Dependent attitude) :
এমন কিছু অধস্তন লক্ষ করা যায় যারা পরনির্ভরশীল মানসিকতা দোষে দুষ্ট । নিজে সিদ্ধান্ত দেয়ার চাইতে অন্যের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত জেনে নিতেই এরা বেশি উৎসাহবোধ করে । কর্তৃত্বের প্রতি নিরাসক্ত এ সকল অধস্তন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব হস্তান্তরে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ।
৩. সমালোচনার ভয় (Fear of criticism) :
দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সমালোচনার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের ফলে অর্জিত কারো সফলতায় অন্যেরাও ভাগ বসানোর চেষ্টা করে । কিন্তু কাজে ভুল-ত্রুটি হলে সমালোচনা করার লোকের অভাব হয় না। সে ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন ঐ কাজের সকল দায় অধস্তনের ওপর চাপাতে চায় । তাই সমালোচনার ভয়েও অনেক অধস্তন কর্তৃত্ব নিতে চায় না ।
৪. তথ্যের অভাব (Lack of information) :
একজন নির্বাহীকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে তার কাছে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য থাকতে হয় । একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর যেভাবে তথ্য জানা থাকে বা তার পক্ষে তথ্য সংগ্রহ সহজ হয় অধস্তনের পক্ষে তা হয় না। যে কারণে তথ্যের অভাবও অধস্তন নির্বাহীদের কর্তৃত্ব গ্রহণে দ্বিধান্বিত করে ।

৫. প্রণোদনার অভাব (Lack of motivation) :
কর্তৃত্বার্পণের ক্ষেত্রে প্রণোদনার অভাবও অধস্তনদেরকে দায়িত্ব গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। প্রতিষ্ঠানে অধস্তন নির্বাহীদেরকে যে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় তা অনেক ক্ষেত্রে খুবই সীমিত । আর্থিক ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকলে একজন অধস্তন কখনই কর্তৃত্বকে অনুপ্রেরণার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না । ফলে কর্তৃত্বার্পণ বাধাগ্রস্ত হয় ।
উপসংহারে বলা যায়, বর্তমান বৃহদায়তন ব্যবসা-বাণিজ্যের যুগে কার্য সম্পাদনে কর্তৃত্বার্পণ অপরিহার্য হলেও এই কর্তৃত্বার্পণ নানা কারণেই বাধাগ্রস্ত হতে পারে । তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এ সকল সীমাবদ্ধতা নজরে রেখেই কর্তৃত্বাপণের বিষয়টিকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক ।
