আজকের আলোচনার বিযয় কর্তৃত্বার্পণ নীতিমালা/ আদর্শ বা বিবেচ্য বিষয়সমূহ – যা কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণ এর অর্ন্তভুক্ত, নিজে কাজ করলে যতো আস্থার সঙ্গে তার ফলাফল প্রত্যাশা করা যায় কর্তৃত্বার্পণ করে অন্যের নিকট থেকে তা সঠিকভাবে প্রত্যাশা করা যায় না । এ ছাড়া কর্তৃত্বাপণে ভুল হলে তা প্রতিষ্ঠানে নানারূপ জটিলতার সৃষ্টি করে । অথচ যে কোন প্রতিষ্ঠানেই কৰ্তৃত্বার্পণ ছাড়া সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন সম্ভব নয় । তাই কর্তৃত্বার্পণের ক্ষেত্রে একজন ঊর্ধ্বতনকে সবসময়ই সতর্কতার সঙ্গে কতকগুলো নীতি, আদর্শ বা পূর্বশর্ত মেনে চলতে হয় । নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো :

Table of Contents
কর্তৃত্বার্পণ নীতিমালা/ আদর্শ বা বিবেচ্য বিষয়সমূহ
১. দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংজ্ঞায়িতকরণ (Defining responsibility and authority) :
কর্তৃত্বাপণকে কার্যকর ও ফলদায়ক করতে হলে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক স্তরেই দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও সুনির্দিষ্ট করা উচিত । এতে কর্তৃত্বার্পণ সহজ হয় এবং অধস্তন তার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সঠিকভাবে বুঝে নিতে পারে । এতে কার্য সম্পাদন ও নিয়ন্ত্রণ উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা হয় ।
২. ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে সমতা বিধান (Balancing between authority and responsibility):
কর্তৃত্বার্পণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে সমতা রক্ষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা আদর্শ । কারো দায়িত্বের তুলনায় যদি কর্তৃত্ব বেশি হয় তবে তার স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে । অপরপক্ষে যদি কর্তৃত্ব অপেক্ষা দায়িত্ব বেশি হয় তবে তার পক্ষে ঐ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন সম্ভব হয় না । কাউকে প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষার দায়িত্ব দিলে হিসাবের খাতাপত্র তলব ও তা দেখার ক্ষমতাও তাকে দেয়া আবশ্যক ।
৩. উদ্দেশ্যভিত্তিক ক্ষমতা অর্পণ (Delegating power based on objective) :
কর্তৃত্বার্পণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কর্তৃত্বাপণের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা । অর্থাৎ কর্তৃত্বাপণের মাধ্যমে অধস্তনদের কাছ থেকে আমরা কোন্ ধরনের কাজ বা দায়িত্ব পালন প্রত্যাশা করি তা পূর্বেই নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক । প্রতিষ্ঠানে ক্রয় বিভাগ খোলা হলে ঐ বিভাগ খোলার উদ্দেশ্য কী অর্থাৎ সে মোতাবেক উক্ত বিভাগকে ক্ষমতা প্রদান করা আবশ্যক ।
৪. দ্বৈত অধীনতা পরিহার (Avoiding dual subordination) :
দ্বৈত-অধীনতা বলতে একজন ব্যক্তিকে একাধিক ব্যক্তির সরাসরি কর্তৃত্বাধীনে কাজ করাকে বুঝায়। হেনরি ফেওল Unity of Command বলতে যে নীতির কথা বলছেন কর্তৃত্বার্পণের ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়ে। যদি কর্তৃত্ব এমনভাবে অর্পণ করা হয় যাতে কোনো ব্যক্তি বা বিভাগকে একাধিক ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ মানতে হয়। তবে সে ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়া খুবই স্বাভাবিক ।
৫. সুস্পষ্ট কর্তৃত্ব শিকল প্রতিষ্ঠা (Establishing clear chain of command) :
প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কর্তৃত্বরেখা আদেশ দানের গতিপথ নির্দেশ করে । তাই কর্তৃত্বাপণে যাতে কার্যকর কর্তৃত্বরেখা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কর্তৃত্বরেখার বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োজিত নির্বাহীদের সমন্বয়ে তা একটি মজবুত কর্তৃত্ব শিকলের রূপ পায় তাও বিবেচনা করা আবশ্যক। এরূপ কর্তৃত্ব শিকল একটি শক্তিশালী সংগঠন কাঠামো গড়তে এবং নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে ।
৬. দায়িত্ব হস্তান্তরযোগ্য নয় (Responsibility is not transferable) :
কর্তৃত্বাপণের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হলো, কর্তৃত্বার্পণের ফলে অধস্তন জবাবদিহিতার আওতায় আসলেও অব্যবহিত উর্ধ্বতনের নিকট কর্তৃত্বাপণকারীর দায় পূর্ববৎ থাকে। এভাবে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কর্তৃত্বের প্রবাহ সৃষ্টি হয় এবং জবাবদিহির ভাবধারা গড়ে ওঠে। কার্যকর কর্তৃত্বাপণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানে এরূপ ভাবধারা গড়ে তোলা সম্ভব ।

৭. কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় সাধন (Co-ordination between authority and power of decision making) :
অনেক সময় কর্তৃত্বের যথাযথ প্রয়োগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতারও প্রয়োজন পড়ে । তাই কর্তৃত্বার্পণে এ বিষয়টিও সব সময় নজরে রাখা আবশ্যক । বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠানের ওপর দিকে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় । সে কারণে তাদের নিকট থেকে সুষ্ঠুভাবে কাজ আদায়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া আবশ্যক ।
উপসংহারে বলা যায়, বর্তমানে বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্বার্পণ যেমনি অপরিহার্য তেমনি একে কার্যকর ও ফলপ্রদ করতে হলে এক্ষেত্রে উপরোক্ত নীতিমালা বা বিবেচ্য বিষয়সমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে সব সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেই সদা সতর্ক থাকতে হয়।
