আজকের আলোচনার বিযয় যোগ্য নেতৃত্বের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য – যা নেতৃত্ব এর অর্ন্তভুক্ত, নেতৃত্ব হলো যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার একটি শক্তিশালী উপাদান যা অধস্তন জনশক্তিকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে চালনা করে । যদিও ‘যোগ্য নেতৃত্ব’ বলতে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির কতিপয় সাধারণ গুণ বা বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয় তথাপি প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন সমাজে বা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব প্রচলিত রয়েছে । সকল ধরনের নেতৃত্বকে সাধারণভাবে বিশ্লেষণ করলে যোগ্য নেতৃত্বের যে সকল রূপ বা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় তা নিম্নে আলোচিত হলো :

Table of Contents
যোগ্য নেতৃত্বের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য
১. অধস্তনদের সম্পর্কে ধারণা (Clear idea about the subordinates) :
নেতৃত্ব হলো অধস্তনদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করার কৌশল । এরূপ কৌশল প্রয়োগে অধস্তনদের আবেগ-অনুভূতি ও সমস্যা সম্পর্কে নেতার প্রয়োজনীয় ধারণা থাকতে হয় । অধস্তনরা তাদের নেতাকে পথ প্রদর্শক ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পেতে চায়। তাই অধস্তনদের মান, দক্ষতা, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে নেতার জানা থাকলেই শুধুমাত্র অনুসারীদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় ।
২. অনুসারীদের সাথে সহ-অবস্থান (Co-existance with the subordinates) :
নেতা ও অনুসারীদের সহ-অবস্থান, যোগ্য নেতৃত্বের একটি অন্যতম পূর্বশর্ত । নেতৃত্ব কৌশল যেহেতু পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত তাই পরিচালক এবং অধস্তনরা পাশাপাশি অবস্থান না করলে এরূপ কৌশল সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় নেতা কর্মীদের নিকট হতে অনেক দূরে অবস্থান করেন সেক্ষেত্রে ঐ নেতৃত্ব কখনই কার্যকর হতে পারে না।
৩. পরিবেশের সাথে সঙ্গতি বিধান (Adjustment with the environment) :
যোগ্য নেতৃত্বের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, একে সবসময়ই পরিবেশের সাথে সঙ্গতি বিধান করে চলতে হয়। কোনো বিশেষ পরিবেশেই কোনো বিশেষ ব্যক্তি নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করেন । একেক পরিবেশে একেক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি নেতা বিবেচিত হন। যে নেতা যতবেশি পরিবেশ বুঝে অধস্তনদের আদেশ-নির্দেশ প্রদান ও তত্ত্বাবধান করবেন তার পক্ষে তত সফলতা লাভ সম্ভব।
৪. অধস্তনদের আনুগত্য (Loyalty of the subordinates) :
নেতৃত্ব আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অধস্তনদের আনুগত্য না থাকলে নেতৃত্ব কখনই সফলকাম হতে পারে না । এরূপ আনুগত্য স্বেচ্ছামূলক হোক বা বাধ্যতামূলক হোক নেতৃত্বের পক্ষে অধস্তনদের আনুগত্য লাভ প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে অপরিহার্য । অবশ্য নেতা যদি তার আচরণ ও গুণাবলির মাধ্যমে অধস্তনদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারেন সেক্ষেত্রে অধস্তনদের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য লাভ সম্ভব হয় । ফলে বিনা বাক্য ব্যয়ে কর্মীরা নেতার আদেশ-নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকে ।
৫. অধস্তনদের প্রেষণা দান( Motivating subordinates) :
নেতৃত্বের সাথে উৎসাহ দান ও প্রভাবিতকরণের যোগসূত্র রয়েছে। যোগ্য নেতা তার ব্যক্তিত্ব ও আচরণের মাধ্যমে অধস্তনদের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করেন । এ জন্য নেতাকে আর্থিক ও অনার্থিক বিভিন্ন প্রেষণা দানের পদ্ধতি ও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত থাকতে হয় । তাই যোগ্য নেতৃত্ব অধস্তনদের জন্য একটি অতি আবশ্যক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে ।
৬. অনুসারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ (Relationship and communication with the subordinates) :
যোগ্য নেতৃত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তা সব সময়ই অধস্তনদের সাথে কার্যকর সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করে পরিচালিত হয়। নেতার সাথে অধস্তন কর্মীদের যদি যোগাযোগ বা সম্পর্ক না থাকে সেক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্বের প্রশ্নই আসে না । তাই নেতার চিন্তা, ধ্যান-ধারণা ও কর্মপন্থা সম্পর্কে অধস্তনদের অবহিতকরণ এবং কর্মীদের প্রতিক্রিয়া ও কর্ম প্রচেষ্টা সম্পর্কে ধারণা লাভ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সবটাই যোগাযোগ নির্ভর ।
৭. ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের উপস্থিতি (Presence of power and authority) :
নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিষয়টি সম্পর্কযুক্ত। নেতার আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের কারণে অধস্তনরা তার অনুসরণ করে । নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী হলে অধস্তনরা বাধ্যতামূলকভাবে তার আনুগত্য করে । তবে নেতা যদি তার আচার-আচরণ ও গুণাবলির মাধ্যমে অধস্তনদের মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে পারেন সেক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অধস্তনদের স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য লাভ করা সম্ভব হয় ।
৮. ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা (Mentality of taking risk) :
নেতৃত্বের সাথে ঝুঁকি সম্পর্কযুক্ত । কারণ ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব সহ-সম্বন্ধযুক্ত গণ্য করা হয়ে থাকে । নেতা যেহেতু কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন তাই তাকে কাজের দায়িত্ব ও ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয় । যেকোনো নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষমতা ও দায়িত্ব যেহেতু নেতৃত্বের ওপর থাকে ফলে যেকোনো ঝুঁকির উদ্ভব হলে নেতৃত্ব তা মানতে সব সময়ই বাধ্য থাকে ।
৯. নেতৃত্ব কতিপয় গুণের সমষ্টি (Aggregate of some necessary qualities) :
নেতৃত্বের প্রধান কাজই হলো, অধস্তনদের চিন্তা-চেতনা ও কাজকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে পরিচালনা করা । এরূপ পরিচালনা করতে গিয়ে যোগ্য নেতাকে অবশ্যই কতিপয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হয়। এ সকল গুণের মধ্যে অধস্তনদের আচরণ অনুধাবনের ক্ষমতা, দূরদর্শিতা, শক্তি ও সাহস, আত্মসচেতনতা, কার্য ও পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান, উত্তম ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ।

১০. নেতৃত্ব শক্তির সাথে তুলনীয় (Comparable with strength) :
দলীয় যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। নেতৃত্বকে ঘিরে অনুসারীরা একত্রিত হয় ও নেতৃত্বের নির্দেশনায় অধস্তনরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে তৎপর থাকে । নেতৃত্ব দুর্বল হলে অনুসারীদের কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করে; আবার নেতৃত্ব শক্তিশালী হলে অনুসারীদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায় । তাই নেতৃত্বহীন জনশক্তি মাঝিহীন নৌকার সঙ্গে তুলনীয়।
