আজকের আলোচনার বিযয় নেতার ক্ষমতার উৎস বা ভিত্তি – যা নেতৃত্ব এর অর্ন্তভুক্ত, নেতৃত্ব হলো লক্ষ্যার্জনের জন্য অধস্তনদের প্রভাবিত করার কৌশল বা প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ক্ষমতা হলো অন্যদের আচরণকে প্রভাবিত করার সামর্থ্য ।
Table of Contents
নেতার ক্ষমতার উৎস বা ভিত্তি
তাই যে নেতার অধস্তনদের প্রভাবিত করার সামর্থ্য বা ক্ষমতা বেশি তার পক্ষেই তত সফলতার সাথে নেতৃত্বদান সম্ভব । এজন্য একজন নেতা কতটা ক্ষমতাবান তা যেমনি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অন্যান্য সহযোগী অবস্থাসমূহও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে এরূপ উৎসসমূহ দেখানো হলো :

রেখাচিত্রে প্রদর্শিত ক্ষমতার বিভিন্ন উৎস বা ভিত্তি নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. নেতার ক্ষমতা (Power of a leader) :
একজন নেতা সাংগঠনিক পদমর্যাদা ও ব্যক্তিগত যোগ্যতার বলে কতটা সামর্থ্যবান ও যোগ্য তা তার ক্ষমতার প্রধান উৎস হিসেবে গণ্য হয়। একজন নেতার নিম্নোক্ত ক্ষমতা তাকে ক্ষমতাশালী করে থাকে।
ক. আইনানুগ ক্ষমতা (Legitimate power) :
আইনানুগ বা বৈধ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের পদমর্যাদা থেকে উদ্ভূত হয়। প্রতিষ্ঠানের একজন সাধারণ ব্যবস্থাপক বিভাগীয় ব্যবস্থাপকদের ওপর ক্ষমতা ভোগ করেন। এরূপ ক্ষমতাকে আইনানুগ ক্ষমতা বলা যায়। S.P. Robbins 3 M. Coulter বলেন, “Legitimate power represents the power a person has as a result of his or her position in the formal organization hierarchy, ” অর্থাৎ আইনানুগ ক্ষমতা হলো একটা সাংগঠনিক কাঠামোতে পদমর্যাদাগত ক্ষমতা। এই ক্ষমতার বলেই ঊর্ধ্বতন অধস্তনকে সহজে প্রভাবিত করেন।
খ. বাধ্য করার ক্ষমতা (Co-ercive power) :
বাধ্য করার ক্ষমতা বলতে অধস্তনদের প্রয়োজনে শাস্তি প্রদান, ভয় দেখানো বা দমন করার ক্ষমতাকে বুঝায়। এরূপ ক্ষমতা সব সময় একজন নেতা প্রয়োগ করবেন এমন নয়। তবে প্রয়োজনে তিনি তা ব্যবহার করতে পারেন এমন ধারণা অধস্তনদের মনে থাকলে ঊর্ধ্বতনের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগ সহজ হয়। S.P. Robbins বলেছেন, “Co-ercive power that is based on fear.” অর্থাৎ দমন করার ক্ষমতা ভীতি প্রদর্শনের সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল।
গ. পুরস্কৃতকরণের ক্ষমতা (Rewarding power) :
এরূপ ক্ষমতা দমনমূলক ক্ষমতার বিপরীত। এ ধরনের ক্ষমতা অধস্তনদের পুরস্কার প্রদানের সামর্থ্য থেকে উদ্ভূত হয়। এক্ষেত্রে অধস্তন মনে করে, যদি সে ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ সঠিকভাবে পালন করে বা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে তবে তাকে ভাল গ্রেড প্রদান করা হবে, পদোন্নতি দেয়া হবে ইত্যাদি । S.P. Robbins ও M. Coulter বলেছেন, “Reward power represents the power that produces positive benifits or rewards.” অর্থাৎ পুরষ্কৃতকরণের ক্ষমতা হলো অধস্তনদের ইতিবাচক সুযোগ-সুবিধা বা পুরস্কার প্রদান।
ঘ. প্রশংসা অর্জনের ক্ষমতা (Referent power) :
কেউ যদি অন্যের মনে সুধারণা সৃষ্টি করতে পারে বা প্রশংসা অর্জন করতে সমর্থ হয় তবে এর ফলে অন্যদের ওপর তার ক্ষমতার বা প্রভাবের সৃষ্টি হয়। ঊর্ধ্বতন যদি তার ব্যবহার, সততা, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে অধস্তনের মনে সুধারণা সৃষ্টি করতে পারে তবে তা এক ধরনের ক্ষমতায় রূপ লাভ করে। R. W. Griffin-এর মতে, “Referent power represent the personal power that accrues to someone based on identification, imitation, loyalty or earisma.” অর্থাৎ প্রশংসা অর্জনের ক্ষমতা হলো এমন কিছু ব্যক্তিগত ক্ষমতা যা কোনো ব্যক্তির পরিচিতি, অনুকরণ, আনুগত্য অথবা ক্যারিশমার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।
ঙ. বিশেষজ্ঞজনিত ক্ষমতা (Expert power) :
এরূপ ক্ষমতা কোনো বিশেষ কাজে ঊর্ধ্বতনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত হয়। এক্ষেত্রে অধস্তনরা তার ঊর্ধ্বতনের দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে। ফলে তাদের ওপর ঊর্ধ্বতনের প্রভাব পড়ে। S.P. Robbins ও M. Coulter 4, “Expert power is influence wielded as a result of expertise, special skill or knowledge.” অর্থাৎ কোনো কাজ করার বিশেষ দক্ষতা বা জ্ঞান ও পারদর্শিতার কারণে বিশেষজ্ঞ ক্ষমতার দ্বারা অধস্তনদের প্রভাবিত করা যায়।
২. মানবীয় বা আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা (Human or interpersonal skill) :
মানবীয় বা আন্তঃব্যক্তিক আনায় এবং প্ররোচিত ও উৎসাহিত করার দক্ষতাকে বুঝায় । Bartol ও Martin-এর মতে, “Human skills দক্ষতা বলতে ব্যক্তি বা দলকে বুঝে সেভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, নিজস্ব চিন্তার প্রতি তাদের সমর্থন are skills associated with a manager’s ability to work well with others, both as a member of a group and as a leader who gets things done through others”. অর্থাৎ মানবীয় দক্ষতা বলতে একজন ব্যবস্থাপক সংশ্লিষ্ট সেই দক্ষতাকে বুঝায় যার ফলে সে দলীয় সদস্য হিসেবে অন্যদের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলেমিশে কাজ করতে পারে এবং নেতা হিসেবে অন্যদের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত কাজ আদায় করতে সমর্থ হয় ।
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থা (Communication system) :
যোগাযোগ ব্যবস্থা নেতৃত্বের একটা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য । অনুসারী বা অধস্তনদের প্রভাবিত করে লক্ষ্যার্জনের কৌশলই হলো নেতৃত্ব । এই প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে নেতা ও অনুসারীদের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । এরূপ যোগাযোগ সহজ ও ফলপ্রদ হলে নেতা ও কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায় । উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা একজন নেতাকে সকল বিষয় সম্পর্কে সবসময় জ্ঞাত রাখে। যা তাকে কর্মীদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ক্ষমতা প্রদান করে ।
৪. অধস্তনদের মান ও মনোভাব (Quality and mentality of subordinates ) :
অধস্তন জনশক্তি বা অনুসারীদের মান, যোগ্যতা ও দক্ষতা নেতৃত্বের ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অধস্তন জনশক্তি যোগ্য ও দক্ষ হলে নেতা নেতৃত্বদানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সাহসিকতার সাথে উদ্যোগ গ্রহণ ও ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সমর্থ হন । অন্যদিকে অধস্তনরা অযোগ্য ও নিম্ন মনোবলের অধিকারী হলে সেক্ষেত্রে নেতার নিকট থেকে কার্যকর নেতৃত্ব প্রত্যাশা করা যায় না । অধস্তন বা অনুসারীরা নেতা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে তার উপরও নেতৃত্বের প্রকৃতি নির্ভরশীল ।
৫. আনুগত্য ও শৃঙ্খলা (Loyalty and discipline ) :
প্রতিষ্ঠানে আনুগত্য ও শৃঙ্খলার মান নেতৃত্বকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে । অধস্তন জনশক্তি বা অনুসারীদের মধ্যে আনুগত্যের ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হলে এবং প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বিরাজ করলে সেখানে নেতৃত্ব বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী হয় । অন্যদিকে অনুসারীদের মধ্যে অবাধ্যতা ও প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করলে সেখানে নেতৃত্ব কার্যকর হতে পারে না। আমাদের দেশের সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করায় স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার নেতৃত্ব দুর্বল হয়। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিসমূহে আনুগত্য ও শৃঙ্খলার ভাবধারা বজায় থাকায় সেখানকার নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে থাকে ।

৬. প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য (Tradition of organization) :
সাংগঠনিক ঐতিহ্যের কারণেও নেতৃত্ব ভিন্নতর হয়ে থাকে । কোনো প্রতিষ্ঠানে আমলাতন্ত্রের প্রভাব সক্রিয় হলে সেখানে নেতৃত্বের মধ্যে ধীরগতি ও অতি- আনুষ্ঠানিকতার ভাবধারা গড়ে ওঠে। আমাদের সরকারি অফিসগুলোতে অতি আমলাতান্ত্রিকতার কারণে নেতৃত্ব গতিশীল ও বলিষ্ঠ হতে পারে না। অন্যদিকে বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানিতে আমলাতান্ত্রিকতার প্রভাব কম থাকায় নেতৃত্ব শক্তিশালী হয় ।
