ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি ।যা ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধারণা ও নীতিসমূহ অধ্যায় এর অন্তর্ভুক্ত।

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি

 

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি

 

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিগণের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে তাঁদের মতামতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও কতকগুলো মৌলিক বিষয়ে তাঁরা একই ধরনের মতামত পোষণ করেন। আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়লের প্রদত্ত ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা থেকে ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তা হল- পূর্বানুমান ও পরিকল্পনা, সংগঠন, নির্দেশনা, সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণ। লুথার গুলিক ব্যবস্থাপনার কার্যাবলিকে POSDCORB নামক শব্দ দ্বারা বুঝিয়েছেন। ‘POSDCORB’ শব্দটির ‘P’ দ্বারা Planning (পরিকল্পনা), ‘O’ দ্বারা Organising (সংগঠন), ‘S’ দ্বারা Staffing (কর্মীসংস্থান), ‘D’ দ্বারা Directing (নির্দেশনা), ‘Co’ দ্বারা Co- ordinating (সমন্বয় সাধন) ‘R’ দ্বারা Reporting (রিপোর্ট প্রদান) এবং ‘B’ দ্বারা Budgeting (বাজেটকরণ)-কে বুঝানো হয়েছে। এছাড়া জর্জ আর. টেরি, হিক্স ও ওল্লেট, আরনেস্ট ডেল, কুঞ্জ ও অডোন্যাল প্রমুখ ব্যবস্থাপনা বিশারদ ব্যবস্থাপনার কার্যাবলিকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। উল্লিখিত ব্যবস্থাপনা বিশারদগণের চিন্তাধারা ও মতামতের উপর ভিত্তি করে ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি বা প্রক্রিয়াকে নিম্নোক্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে আলোচনা করা যায় :

নিম্নে ব্যবস্থাপনার উল্লিখিত কার্যাবলি সংক্ষেপে আলোচনা করা হল ঃ

(ক) মৌলিক কার্যাবলি (Primary functions)

১। পরিকল্পনা (Planning) :

এটা ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে মৌলিক কাজ। কে, কখন, কীভাবে কোন কাজ সম্পাদন করবে এসব ব্যাপারে অঅগ্রিম সিদ্ধান্ত নেয়াই হচ্ছে পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য নীতি, পলিসি, কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন পরিকল্পনার বিষয়বস্তু। উত্তম পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিকল্পসমূহ হতে সর্বোত্তম সিদ্ধান্তটি বেছে নেয়া হয়। সংগঠনের প্রত্যেক স্তরে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

সাধারণত অতীত অভিজ্ঞতা, বর্তমান পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও দুর্বলতা ইত্যাদি বিবেচনা করে পরিকল্পনা প্রণীত হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, “ভবিষ্যতে কী করতে হবে তার অগ্রীম সিদ্ধান্ত গ্রহণই পরিকল্পনা।” (Planning is deciding in advance what is to be done in future.).

২। সংগঠন (Organising) :

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপরিহার্য উপকরণ বা কৌশল হচ্ছে সংগঠন। যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য একযোগে কার্য সম্পাদন করে, তখনই তাদের কর্মপ্রচেষ্টাকে সমন্বিতকরণের জন্য সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সংগঠন হচ্ছে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কার্যাবলির একটি কাঠামো বিন্যাসকরণ এবং কার্যাবলিকে প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করা,

 

প্রত্যেক বিভাগের দায়দায়িত্ব বিভাগীয় প্রধানের অধীনে এনে কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন ও দায়দায়িত্বের সুষম বণ্টন করা এবং প্রত্যেক কর্মীকে তাদের উপর অর্পিত দায়দায়িত্বএকটি সংগঠন কাঠামোর মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের, কতজন কর্মী প্রয়োজন তা জানা যায়। কর্মীসংস্থান বলতে কার্য বিবরণ অনুযায়ী বিভিন্ন পদে কর্মী নির্বাচন, নিয়োগ, তাদের কাজের মূল্যায়ন, বেতন ও মজুরি নির্ধারণ, পদোন্নতি ইত্যাদিকে বুঝায় ।

৪। নির্দেশনা (Directing) :

পরিকল্পনামাফিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মীকে নির্দেশ পালন করতে হয়। ব্যবস্থাপক কোন্ কাজ কখন, কীভাবে সম্পাদন করবেন নির্দেশনার মাধ্যমে তা কর্মীকে অবহিত করান। কার্য সম্পাদনে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দান নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। বৃহত্তর অর্থে প্রেষণা, পরিচালনা, নেতৃত্ব, উপদেশ, যোগাযোগ ইত্যাদি সমস্ত কাজই নির্দেশনা প্রক্রিয়ার অন্তর্গত।

৫। প্রেষণা (Motivating) :

পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কর্মীদেরকে কোন কার্য সম্পাদনের জন্য প্ররোচিত করার প্রক্রিয়াকে প্রেষণা বলে। প্রেষণা কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, নৈতিকতা, মনোবল, কর্তব্যনিষ্ঠা ও কার্য সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। প্রেষণার প্রধান উদ্দেশ্য কর্মীর সম্ভাব্য (Potential) কার্যক্ষমতা ব্যবহারের জন্য ও কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করা, যা কর্মীর কার্য সম্পাদনের ক্ষমতা (Ability) ও কার্য সম্পাদনের ইচ্ছার মধ্যে ব্যবধান দূর করে। প্রেষণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন আর্থিক ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেমন- বোনাস, মুনাফা, বণ্টন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ ইত্যাদি।

৬। সমন্বয় সাধন (Co-ordinating):

বিভিন্ন ব্যক্তি বা বিভাগের কাজের মধ্যে ঐক্যতান সৃষ্টি করাই হচ্ছে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ব্যক্তি বা বিভাগের কাজের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা একান্ত অপরিহার্য, অন্যথায় উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে। সমন্বয়ের অভাবে প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, অহেতুক বিলম্ব হয়, কার্য সম্পাদনে খরচ বৃদ্ধি পায় এবং কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

৭। নিয়ন্ত্রণ (Controlling) :

পরিকল্পনা মোতাবেক যাবতীয় কার্যাবলির গুণগত ও পরিমাণগত মান সম্পাদনের সুনিশ্চিতকরণকে নিয়ন্ত্রণ বলে। পূর্বনির্ধারিত কাজের সঙ্গে প্রকৃত কাজের তুলনাকরণ ও দুয়ের মধ্যে কোন বিচ্যুতি থাকলে তা চিহ্নিতকরণ এবং পরিশেষে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ : প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়ন্ত্রণ অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের অভাবে কাজের মান ক্ষুণ্ণ হয়, অহেতুক খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়।

খ) গৌণ কার্যাবলি (Secondary functions)

১। (Innovation):

ব্যবস্থাপনা হচ্ছে একটি সৃজনশীল কাজ। নতুন নতুন পদ্ধতি, কৌশল ও ধারণা উদ্ভাবনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপক সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতার টিকিয়ে রাখে। একদিকে যেমন ঝুঁকি হ্রাস পায়, অন্যদিকে তেমনি কাজের দক্ষতা বাড়ে ও মিতব্যয়িতা অর্জিত হয়। নতুন কিছু সৃষ্টি করার জন্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বদা পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষণ ও গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়। তাই পিটার এ ব্রাকার বলেছেন, “Managing business cannot be bureaucratic an administrative, or even a policy
making job. It must be a creative rather than an adaptive task.”

২। উপস্থাপন (Representation) :

ব্যবস্থাপনাকে বাইরের বিভিন্ন পক্ষ, যেমন- সরকার, শ্রমিক সংগঠন, পৌর শিল্প ও বণিক সংস্থা, বিভিন্ন অর্থসংস্থা এবং বহির্বিশ্বের সামনে কারবারকে উপস্থাপন করতে হয়। ব্যবস্থাপনার উচ্চস্তর হতে শুরু করে নিম্নস্তর পর্যন্ত অর্থাৎ ব্যবস্থাপক পরিচালক হতে আরম্ভ করে উৎপাদন-ব্যবস্থাপক ও ফোরম্যান পর্যন্ত সকলেই নিজেদের গণ্ডির মধ্য থেকে কারবারকে উপস্থাপন করতে পারেন।

৩। যোগাযোগ (Communication)ঃ

সি এবং ওপ্লেট যোগাযোগকে ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বসে দাবি করেছেন। যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনা একে অপরের পরিপূরক। যোগাযোগ ছাড়া ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্য সম্পাদন অসম্ভব। যোগাযোগ-এর গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেক লেখক আবার একে পৃথক কাজ হিসেবে না দেখে ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজের মূল ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

৪। রিপোর্ট প্রণয়ন (Reporting) :

রিপোর্ট প্রণয়ন কার্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক কার্য নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে পড়ে। ব্যবস্থাপককে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে সম্পাদিত কার্যের বিবরণী বা রিপোর্ট প্রণয়ন করতে হয়। রিপোর্টের ভিত্তিতে কার্যের মূল্যায়ন ও ফলাফল পরিমাপ করা যায়।

৫। বাজেটকরণ (Budgeting) :

বাজেট পরিকল্পনার সংখ্যাভিত্তিক প্রকাশ। তাই একে পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা ব্যবস্থাপনারই কাজ। ব্যবস্থাপনার উল্লিখিত কার্যাবলি পরস্পর পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত ও পরিপূরক। এগুলোর কোন একটি কার্য অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, এরা নিরবচ্ছিন্নভাবে চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এ কারণেই অনেকে ব্যবস্থাপনাকে একটি অবিরাম ও
ঘূর্ণায়মান চক্র বলে অভিহিত করেন। নিম্নের চিত্রে ব্যবস্থাপনা কার্যাবলির নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া দেখানো হল
সমন্বয়সাধন

 

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি

Leave a Comment