আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধা।
Table of Contents
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধা

উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক কাজ। এ কাজের ওপর ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজের কার্যকারিতা নির্ভর করে। সঠিকভাবে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রণয়ন করা গেলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জন সহজ হয়ে যায়। বা সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
ব্যবস্থাপনাবিদ LA.Allen (এল.এ. অ্যালেন) উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ গুরুত্ব উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, “Planning is a trap to capture the fore অর্থাৎ ভবিষ্যতকে ধরার ফাঁদই হলো উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ । নিম্নে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহন গুরুত্ব বা সুবিধা বা প্রয়োজনী আলোচনা করা হলো
১। সঠিক নির্দেশনা (Proper guidance) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভবিষ্যত কার্যক্রমের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে কার্যসমূহকে কখন, কীভাবে, কত সময়ব্যাপী সম্পাদন করবে তার অগ্রিম নির্দেশনা উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে পাওয়া যায়। এরূপ নির্দেশনা অনুসরণের ফলে নির্ভুল ও দ্রুততার সাথে কাজসমূহ সম্পাদিত হয়।
২। ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা হ্রাসকরণ (Reducing risk and uncertainty) :
ব্যবসায়কে ঝুঁকির খেলা’ (Game of risk) বলা হয়। ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানেই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। ব্যবসায়ে বিদ্যমান ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা দূরীকরণের প্রধান উপায় হলো পরিকল্পিতভাবে সম্পাদন করা।
৩। সম্পদের কার্যকর ব্যবহার (Effective use of resources) :
পরিকল্পিতভাবে মানবীয় ও বাস্তুগত সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। কোন সম্পদ কোথায়, কি পরিমাণে ব্যবহৃত হবে সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে পাওয়া যায়।
৪। মিতব্যয়িতা অর্জন (Achieving economy) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর্মীদের দক্ষভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। তা ছাড়া উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনুযায়ী সময়মতো, সুনির্দিষ্ট উপায়ে এবং সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করে কার্য সম্পাদন করার কারণে সামগ্রিকভাবে সকল কাজে মিতব্যয়িতা অর্জিত হয়। এতে বাহুল্য ব্যয় হ্রাসের ফলে মুনাফা বৃদ্ধি পায়
৫। প্রেরণা সৃষ্টি (Creating inspiration) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে প্রতিটি বিভাগ, শাখা ও কর্মীর কার্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এরূপ লক্ষ্য বা কার্য নির্ধারণ কর্মীদের নিকট প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্মীরা এ লক্ষ্য অর্জন বা কার্য সম্পাদনের মধ্য দিয়ে আত্মতৃতি লাভ করে।
৬। ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কাজের ভিত্তি (Basis for other managerial functins) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কাজের ভিত্তি বলা হয়। কেননা উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোকে ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজ যেমন- সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা, নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কার্য সম্পাদিত হয়ে থাকে। উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাপকীয় অন্যান্য কাজের সফলতা নিশ্চিত করে।
৭। সমস্যার দ্রুত সমাধান (Rapid solutions of problems) :
প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়তই নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখিন হয়ে থাকে। এসব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হয়। একার্থক পরিকল্পনা তথা পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপক খুব দ্রুত সমস্যাসমূহ সমাধানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
৮। ব্যবসায়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (Business growth and expansion) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন সমস্যা ও সুযোগ-সুবিধা বিশ্লেষণ করা হয়। এরূপ সমস্যা ও সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে সমস্যাসমূহ খুব দ্রুততার সাথে সমাধান করা যায় এবং সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ তরান্বিত হয়।
৯। দক্ষতা অর্জন (Efficiency) :
কার্য সম্পাদনের সর্বোত্তম বিকল্প পন্থাকে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরুপ উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্য সম্পাদনের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা যেমন- কোন কাজ কখন, কীভাবে, কারা সম্পাদন করবে এবং সময় ও সম্পদের বরাদ্ধ কী হবে প্রভৃতি সম্পর্কে স্বচ্ছ নির্দেশনা প্রদান করে। এতে সুশৃঙ্খলভাবে মিতব্যয়িতার সাথে সময়মতো কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জিত হয়।
১০। নিয়ন্ত্রণে সহায়তা (Assistance in controlling) :
নিয়ন্ত্রণকে ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ ধাপ বলা হলেও এটি শুরু হয় উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে। নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার প্রথমে কাজের আদর্শমান নির্ধারণ করা হয়। অতপর এ আদর্শমানকে কেন্দ্র করে ত্রুটিবিচ্যুতি নির্ধারণপূর্বক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় এরূপ আদর্শমান নির্ধারণ এক ধরনের উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সুতরাং নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
১১। ভবিষ্যৎ দর্শন (Forceseeing future) :
উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ভবিষ্যৎ দর্পণ বলা হয় । উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ দেখেই ভবিষ্যতের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । এরূপ ধারণা ব্যবস্থাপকদের সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়ক হয় ।
১২। ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা (Establishing equilibrium) :
বিভিন্ন বিভাগ, উপবিভাগ, শাখা, দল বা ব্যক্তির কাজে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে কার্য বণ্টন বা দায়িত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ, শাখা, দল বা ব্যক্তির কাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। এরূপ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা সময়মতো সকল বিভাগ ও ব্যক্তির কাজ সম্পন্ন করতে সহায়তা করে।
১৩। শৃঙ্খলা রক্ষা (Maintaining discipline) :
প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনুযায়ী কাজ করা হলেই সকল ব্যক্তি ও বিভাগে সুশৃঙ্খলভাবে কার্য সম্পাদিত হবে। কেননা উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ সকল কর্মীর মধ্যে উত্তম উপায়ে দায়িত্ব বন্টন করে এবং বিভাগ ও শাখাগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ছোটবড় সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি অপরিহার্য বিষয়। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে প্রতিষ্ঠানকে সফলভাবে পরিচালনা করতে হলে সময়োপযোগী উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কেননা উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রতিষ্ঠানের সকল কাজের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এজন্যই Donnelly (ডোনেলি) ও তাঁর সহযোগীগণ যথার্থই মন্তব্য করেছেনে, ‘Planning is the keystone management function.” অর্থাৎ, উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থাপনার মূল কাজ ।

