ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বা ভূমিকা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনার পরিচিতি” বিষয়ক পাঠের অংশ। অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সমাজের সকল পর্যায়ে সভ্যতার শুরু হতে কম বেশি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে তীব্র প্রতিযোগিশীল বিশ্বে এর গুরুত্ব দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। N. C. Roy Chowdhury ভালো ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে বালির ওপর নির্মিত গৃহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যা যে কোনো সময় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। নিম্নের ছকে ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব উল্লেখিত হলো :
Table of Contents
ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বা ভূমিকা

১. উপকরণাদির সুষ্ঠু ব্যবহার (Proper utilization of resources) :
ভূমি, শ্রম, মূলধন ইত্যাদি উপাদান কোথাও থাকাই উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয় । এগুলোর যথাযথ সদ্ব্যবহারের জন্য যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তাই ব্যবস্থাপনা । Terry ও Franklin বলেছেন, “ব্যবস্থাপনা হলো সেই ধরনের কাজ যা অসংগঠিত মানুষ ও বস্তুগত সম্পদকে ব্যবহারযোগ্য ও ফলদায়ক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।”
২. বৃহদায়তন উৎপাদন (Large scale production) :
বর্তমান বৃহদায়তন ও জটিল উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৃহদায়তন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের প্রতিষ্ঠান । আর এরূপ প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষেত্রে একদল দক্ষ ব্যবস্থাপক ও তাদের দক্ষ পরিচালনা অপরিহার্য ।
৩. দক্ষতা বৃদ্ধি (Increase of efficiency) :
ব্যবস্থাপনার কাজ হলো উপায়-উপাদানের ফলপ্রদতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জন করা। বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি একান্তভাবেই যোগ্য ব্যবস্থাপকের ওপর নির্ভর করে । অন্যথায় প্রতিযোগিতার খেলায় টিকে থাকা সম্ভব নয় ।
৪. অপচয় হ্রাস (Reduction of wastage) :
ব্যবস্থাপনা উপায়-উপকরণের দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের অপচয় হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । অপচয় বলতে শুধুমাত্র অর্থের বা জিনিসপত্রের অপব্যবহার ও বিনষ্ট হওয়াকেই বুঝায় না এর সঙ্গে নিয়োজিত জনশক্তি ও যন্ত্রপাতির শ্রম ঘন্টার অপচয়ও জড়িত । যোগ্য ব্যবস্থাপনার পক্ষেই এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ।
৫. শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা (Restoration of discipline) :
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে শৃঙ্খলার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থাকে মূলত পরিচালক বা ব্যবস্থাপকের ওপর । আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বিশৃঙ্খলা লক্ষণীয় এর পিছনে মূল কারণ হলো ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনের অদক্ষতা ।
৬. সম্পর্কের উন্নয়ন (Development of relations) :
উদ্দেশ্যার্জনের জন্য বর্তমানে ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য হলো মালিক, শ্রমিক তথা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল পক্ষের মধ্যে উত্তম সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখা । ব্যবস্থাপনার এরূপ প্রচেষ্টা মানব সম্পর্ক উন্নয়ন ও ব্যক্তিক বিকাশের পথকে সহজ করে ।
৭. কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি (Creation of employment opportunity) :
ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক উপায়-উপাদানের ফলপ্রদতাই বৃদ্ধি করে না, প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে । যা দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।
৮. গবেষণা ও উন্নয়ন (Research and development) :
ব্যবস্থাপনা বর্তমানকালে নিত্য-নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের নব নব দিগন্ত নির্দেশ করে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই আজ নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়ন সহজতর হয়েছে ।
৯. জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Improving the living standard) :
জীবনযাত্রার মান নির্ভর করে মানুষের মাথাপিছু আয় ও ভোগের ওপর। যেকোনো দেশেই মানুষের আয় বৃদ্ধি ও ভোগের সুযোগ সৃষ্টিতে দক্ষ ব্যবস্থাপকদের ভূমিকা অনন্য ।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে দক্ষ ব্যবস্থাপনা যেরূপ প্রত্যক্ষ ফল প্রদানে সামর্থ্য হয়েছে তার সাথে কিছুরই তুলনা করা চলে না। তাই Urwick & Brech যথার্থই বলেছেন, “কোনো আদর্শ, কোনো মতবাদ, কোনো রাজনৈতিক তত্ত্বই মানবীয় ও বস্তুগত উপকরণের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে কম শক্তিতে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারে না; যা একমাত্র দক্ষ ব্যবস্থাপনার পক্ষেই সম্ভব।” (No ideology, no ‘ism’, no political theory can win a greater output with less effort from a given complex of human and material resources, without sound management)
