আজকের আলোচনার বিযয় কমিটির কার্যকর ব্যবহারের জন্য সুপারিশসমূহ – যা সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন এর অর্ন্তভুক্ত, বর্তমান বৃহদায়তন কর্মকাণ্ডের জগতে সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সমাধার জন্য শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সৃষ্ট সরলরৈখিক কর্তৃত্ব বা নিয়োগকৃত পদস্থ কর্মী অথবা উভয়ের মিলিত কর্মপ্রয়াসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।

Table of Contents
কমিটির কার্যকর ব্যবহারের জন্য সুপারিশসমূহ
তাই সেখানে কমিটি গঠন অনেক সময়ই ভালো ফল দেয়। উপযুক্ত ক্ষেত্রে কমিটি গঠন করলেই তা হতে ভালো ফল পাওয়া যাবে এমন নয়। এর যে সকল অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, তা সামনে রেখে এবং এক্ষেত্রে কতিপয় নির্দেশিকা মেনে চলে কমিটি গঠন ও এর কার্যক্রম পরিচালনা করলেই এথেকে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। তবে কমিটিকে কার্যকর করার জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশমালা গ্রহণ করা যেতে পারে :
১. উপযুক্ত ক্ষেত্রে বা বিষয়ে কমিটি গঠন (Forming committee in proper field or subject) :
Committee is not sure cure for all administrative difficulties-এ বিষয়টি সামনে রেখে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বা বিষয়ে কমিটি গঠন করা আবশ্যক। অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বা বিষয়ে কমিটি গঠন করা হলে তা প্রতিষ্ঠানে অহেতুক জটিলতা বৃদ্ধি করে । এতে সহজ বিষয়ও জটিল হয়ে পড়ে এবং ঊর্ধ্বতনের কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। তাই যে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, যৌথ বিচার-বিবেচনা অত্যাবশ্যক, ব্যাপক ও বিচিত্র তথ্যের প্রয়োজন, কালক্ষেপণ করা দরকার- এ ধরনের ক্ষেত্রেই কমিটি গঠন করা হলে তা হতে কাক্ষিত ফল লাভ সম্ভব হয় এবং তা প্রতিষ্ঠানের জন্য উপকারী হতে পারে।
২. সুসংজ্ঞায়িত ক্ষমতা ও দায়িত্ব (Well-defined authority and responsibility) :
উপযুক্ত ক্ষেত্রে কমিটি গঠন করলেই চলে না, কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য এবং এর কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত। যাতে এর সকল সদস্য কমিটিতে তার কাজ কী হবে সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে। প্রত্যেক সদস্যই যদি তার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে তবে কমিটির সাফল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়।
অধ্যাপক নিউম্যান এ সম্পর্কেই বলেছেন, “It should be made clear whether committees are to serve in an advisory, co-ordinative capacity, or whether their decisions are authoritative and if so, upon whom, ” অর্থাৎ কোনো কমিটি পরামর্শমূলক ও সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করবে, না তাদের সিদ্ধান্ত কর্তৃত্বমূলক হবে এবং হলেও তা কাদের ওপর বর্তাবে এ জাতীয় বিষয়গুলো সুস্পষ্টরূপে নির্ধারণ করে উচিত নেওয়া
৩. কাম্য সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ (Determining optimum size of the committee) :
কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য ও কাজের প্রকৃতি বিবেচনায় এর সদস্য সংখ্যা অবশ্যই কাম্য পরিমাণের হওয়া উচিত । সদস্য সংখ্যা অহেতুক বেশি হলে তা এর কার্যক্রমকে অধিক ধীরগতিসম্পন্ন করে। এ ছাড়া কমিটির সভা অহেতুক বাক- বিতণ্ডার কর্মস্থলে পরিণত হয়।
আবার সদস্য সংখ্যা একেবারে কম হলে তাতেও দলবদ্ধ বিচার-বিবেচনা ও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়। অইরিক ও কুঞ্জ এরূপ সদস্য সংখ্যা সম্পর্কে একটা জরিপের ফলাফল তুলে ধরে বলেছেন, “The ideal committee size may be five when the five members possess adequate skills and knowledge to deal with problems facing the committee”.51 অর্থাৎ একটা আদর্শ কমিটির আকার ৫ জন হতে পারে যদি উক্ত পাঁচজন সদস্য প্রত্যেকেই কমিটিতে উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলা করার মতো প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাসমৃদ্ধ হয় ।
৪. উপযুক্ত সদস্য বাছাই (Selecting appropriate members) :
কমিটিকে কার্যকরী করার ক্ষেত্রে উপযুক্ত সদস্য বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হলে ঐ কমিটির সদস্যদের অবশ্যই উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের গুণসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত সমন্বয় কমিটিতে মূল বিভাগসমূহের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত ।
প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের জনশক্তির সমন্বয়ে কমিটি গঠনের প্রয়োজন দেখা দিলে সেখানে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা আবশ্যক । তবে যারাই কমিটির সদস্য হবেন তাদের কমিটি ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন ।
G. R. Terry এ সম্পর্কে বলেছেন, “The committee members need to have a mutual respect for each other’s interests to understand the several possible view points presented about an issue, to express themselves clearly and concisely to think independently and to integrate, as well as compromise, tentative conclusions presented for action.”
অর্থাৎ কমিটি সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে যাতে করে কোনো ইস্যুতে বিভিন্ন সদস্যদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিসমৃদ্ধ অভিমত প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে পারে, প্রত্যেকের মতামত সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করতে পারে ও স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে এবং সম্ভাব্য কর্মপন্থাকে সমন্বিত করতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় আপসরফার মধ্য দিয়ে সমাধানে পৌঁছতে পারে ।
৫. উপযুক্ত সভাপতি বা নেতা নির্বাচন (Selecting right chairperson or leader) :
কমিটি এমন একটি সাংগঠনিক ব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক সদস্যই মোটামুটি পদমর্যাদার বিচারে বা কমিটির প্রয়োজন বিচারে সদস্য হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করে। কমিটির কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুসরণের কারণেই মতামত প্রদানে এর সকল সদস্যই সমান ক্ষমতার অধিকারী হয়। এ ছাড়া বিভক্ত দায়িত্বের কারণে এর কার্যক্রমে কারোর তেমন বিশেষ উৎসাহ থাকে না। তাই কমিটির কার্যক্রমকে ফলদায়ক করতে হলে উপযুক্ত সদস্য বাছাইয়ের পাশাপাশি এর এমন একজন সভাপতি নির্দিষ্ট করা উচিত যে উৎসাহী ও উদ্যমী হয় । অন্যদের ওপর তার প্রভাব থাকে ।
সঠিক কর্মসূচি প্রণয়ন ও অন্যদেরকে কাজে লাগিয়ে কমিটির কার্যক্রমকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় । তাই নিউম্যান কমিটির একজন যোগ্য চেয়ারম্যান সম্পর্কে বলেন, “He does not do all the work himself, but he sets in motion the mechanism whereby the group action becomes purposeful and efficient.” অর্থাৎ তিনি নিজে সব কাজ করেন না, তবে তিনি কর্মপন্থাকে গতিশীল করেন যার দ্বারা দলীয় কার্যক্রম উদ্দেশ্যপূর্ণ ও দক্ষতাপূর্ণ হয় । কমিটিতে কাজের বাইরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাই কমিটির কার্যক্রম
৬. সুষ্ঠু কর্ম নিয়মাবলির নির্দেশ (Providing proper working procedure) :
কমিটির সদস্যরা কীভাবে পরিচালিত হবে সেজন্য পূর্ব থেকেই সুষ্ঠু কর্ম নিয়মাবলি নির্দিষ্ট করে দেওয়া আবশ্যক। যাতে সে অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ক্রমে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে । সভাকে ফলদায়ক ও কম সময়সাপেক্ষ করার জন্য পূর্ব থেকেই প্রয়োজনীয় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সভা অনুষ্ঠানের উপায় বা পদ্ধতি কী হবে এগুলো পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট থাকলে তা কমিটির কাজকে ত্বরান্বিত করে ।
৭. প্রয়োজনীয় কর্মী সহযোগিতা প্রদান (Providing necessary staff assistant) :
কমিটির কাজকে গতিশীল ও ফলপ্রদ করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রয়োজনীয় পদস্থ কর্মী (Staff) দ্বারা একে সহযোগিতা করা । এজন্য প্রয়োজনে কমিটির একজন সেক্রেটারি নিয়োগ করা যেতে পারে । যার কাজ হলো সভাপতির নির্দেশ অনুযায়ী কমিটির সভার বিজ্ঞপ্তি তৈরি, সদস্যদের কাছে তা যথাসময়ে প্রেরণ, সভার কার্যসূচি তৈরি, নানাবিধ অফিস কর্ম সম্পাদন, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সভার কার্যবিবরণী প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কার্যবিবরণী ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রেরণ ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করা ।
এতে কমিটির সভাপতির পক্ষে কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। সব কিছু পূর্ব থেকে ঠিকঠাক থাকায় কমিটির সদস্যরা তাদের কাজে অধিক মনোনিবেশ করতে পারে । এতে অল্প সময়ে কমিটির পক্ষে কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হয় ।
৮. দলীয় চেতনার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ (Inspiring with team spirit) :
কমিটির সদস্যদের একত্রে একটি সংস্থা (Body) হিসেবে গণ্য করা হয় । তাই কমিটির কাজের সফলতা এর প্রত্যেক সদস্যের সাফল্য এবং এর ব্যর্থতা প্রত্যেক সদস্যের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে । তাই কমিটির প্রত্যেক সদস্য যদি দলীয় ঐক্য ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হয় তবে কমিটি কখনই সাফল্যের মুখ দেখতে পারে না । কারণ এখানে ইচ্ছে করলে কোনো একক সদস্য কমিটির কাজে বা আলোচনায় অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
কোনো আলোচনা পূর্ণতা প্রাপ্তির পূর্বেই বাইরে প্রকাশ করে দিয়ে কমিটিকে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলায় ফেলে দিতে পারে। তাই ঊর্ধ্বতনের পক্ষ হতে কমিটির সদস্যদের দলীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। এজন্য যোগ্য সদস্য বাছাইয়ের বাইরেও ঊর্ধ্বতনের পক্ষ হতে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা, কমিটির মতামতের প্রতি গুরুত্বারোপ, প্রয়োজনে কমিটির সদস্যদের উপযুক্ত সম্মানী প্রদান ইত্যাদি কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করে একে অধিক ফলপ্রদ করে তুলতে পারে ।
৯. ব্যয় হ্রাসের প্রতি গুরুত্বারোপ (Emphasizing on cost reduction) :
কমিটির সিদ্ধান্ত বা কার্যফলের তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণও এর কার্যাকার্যের ফলাফল পরিমাপে উল্লেখযোগ্য বিবেচ্য বিষয় । কম ব্যয়ে যাতে কমিটি হতে কার্যকর ফল লাভ করা যায় এজন্য ঊর্ধ্বতনকে সব সময়ই সতর্ক থাকা উচিত। এজন্য কমিটির কার্যক্রম এমনভাবে সাজানো ও পরিচালনা করা দরকার যাতে ব্যয়ের পরিমাণ সর্বনিম্ন হয়।
সাধারণভাবে কমিটির সদস্যদের স্ব-স্ব বিভাগে দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকায় বিভাগীয় দায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সময়ে কমিটির সভা আহ্বান করা উচিত নয় । এতে স্বাভাবিকভাবেই পরোক্ষ ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া কমিটির কাজে যাতে অহেতুক সময়ক্ষেপণ না হয় এবং অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য খরচ বৃদ্ধি না পায়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত ।
১০. যথাযথ অনুসরণ ও কালান্তিক মূল্যায়ন (Proper follow-up and periodic evaluation) :
কমিটির কাজ যাতে লক্ষ্যমাফিক এগিয়ে যেতে পারে এজন্য প্রথম হতেই এর যথাযথ অনুসরণ ও সময়ে সময়ে এর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা আবশ্যক । এজন্য অস্থায়ী কোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এ কমিটি কতদিনে তাদের কাজ শেষ করবে তার একটা সময় নির্ধারণ করে দিতে হয়।
কমিটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে কিনা তা সময়ে সময়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এজন্য কমিটিকে কোনো সহযোগিতা বা পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন হলে তাও দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় সময় শেষে দেখা যায় কমিটির পক্ষে কাজ সম্পাদন সম্ভব হয়নি এবং এক সময়ে কমিটির আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না । স্থায়ী কমিটির ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতনের পক্ষ হতে কাজের খোঁজখবর গ্রহণ, কাজের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা আবশ্যক। এজন্য মাঝে-মধ্যে পর্যালোচনা বৈঠক করা যেতে পারে ।

উপসংহারে বলা যায়, উপযুক্ত ক্ষেত্রে বা বিষয়ে উপযুক্ত সভাপতি ও সদস্য সমন্বয়ে কমিটি গঠন করলেই হবে না তাকে ফলপ্রসূ করতে হলে এর কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন দিকের প্রতি অবশ্যই যথাযথ গুরুত্ব দেয়া উচিত ।
তাই কীভাবে কমিটির কার্যক্রমকে ফলদায়ক করা যেতে পারে বা এটা নিশ্চিত করা সম্ভব এ সম্পর্কে G R. Terry বলেন, কমিটির কাজকে ফলদায়ক করার ক্ষেত্রে একটি সন্তোষজনক ধারণা হলো কমিটির উদ্দেশ্য ও আওতা, এর কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে এর সম্পর্ক কিরূপ হবে তা লিখিতরূপে বিনির্দিষ্টকরণ করা আবশ্যক।” (A satisfactory approach is to provide written specifications outlining the purpose and scope of the committee, its authority, its responsibility and its relationships with the organizational units of the enterprise.)
