কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। বিভাগের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কাজকে বুঝায়। সংগঠনকে একটা গাড়ির সাথে তুলনা করা যায়। গাড়ির সংগঠন বলতে কার্য বিভাজন বা বিভাগীয়করণ, কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব নির্ধারণ ও অর্পণ এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও ডিজাইনে ভুল হলে বা বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে সংযুক্ত না করলে গাড়ি চলে না । আবার গাড়ির চালর বা সংশ্লিষ্টরা যোগ্য না হলে বা গাড়ি যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা মেরামত করা না হলে গাড়িতে সমস্যা দেখা দেয়। খুবই স্বাভাবিক ।
একটা সংগঠনও কমবেশি সে ধরনের। তদুপরি নানান পারিপার্শ্বিকতাও সংগঠনকে প্রভাবিত করে । যে কারণে একটা সংগঠনকে কার্যকর রাখতে সবসময়ই এর প্রতি অব্যাহত নজর রাখতে হয়। এক্ষেত্রে। করণীয়সমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো :
Table of Contents
কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠা

১. পরিকল্পনার মাধ্যমে সংগঠনের ভুলত্রুটি পরিহার (Avoiding mistakes in organizing by planning):
ব্যবস্থাপনার সকল কাজের ভিত্তি হলো পরিকল্পনা । তাই কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠাতেও পরিকল্পন
খুবই গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিষ্ঠানের শুরুতে সংগঠন বিষয়ক পরিকল্পনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
ক) উদ্দেশ্যার্জনে প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো কী হবে সেটা ঠিক করা (job design);
খ) কাজগুলোকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করা (Departmentation);
গ) প্রতিটা বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব কী হবে তা নিরূপণ ও অর্পণ করা (Authority & responslibility);
ঘ) কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত না বিকেন্দ্রীভূত হবে তা ঠিক করা (Centralization and decentralization) ও
ঙ) প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত কর্তৃত্ব সম্পর্ক সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা (Setting authority relationship) | সংগঠন প্রতিষ্ঠাকালে উপরোক্ত কোনো বিষয়ে ভুল বা দূর্বলতা থাকা অসম্ভব নয়। সংগঠন পরিচালনাকালে এই সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হয়। তখন নতুনভাবে পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যাগুলো দূরীকরণের পদক্ষেপ নেয়ার
প্রয়োজন পড়ে । এ পর্যায়ে পরিকল্পনার মধ্যে আসতে পারে-
i) সংগঠন কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসাধন;
ii) কর্তৃত্ব সম্পর্ক পুনঃস্থাপন;
iii) সংগঠনের মানবীয় উপাদানের প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং
iv) ভবিষ্যৎ প্রয়োজন উপযোগী কর্মীসংস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ ।
২. সাংগঠনিক অনমনীয়তা পরিহার (Avoiding organizational inflexibility):
সংগঠন সংশ্লিষ্ট বিভাগ, কাজ, কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব ও এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সবমিলিয়ে সংগঠনের কাজে এক ধরনের অনমনীয়তার প্রতি ঝোঁক প্রবণতা লক্ষণীয় । একটা বিভাগ খুললে ঐ বিভাগ বন্ধ করা যায় না, একজনকে কর্তৃত্ব দিলে তা প্রত্যাহার করা যায় না-এভাবে প্রতিষ্ঠান যতই চলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি বিধানে সংগঠন ততই অকার্যকর হয়ে পড়ে । এটি দূরীকরণে নিম্নরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে :
ক) কাজ পুন:সংগঠিতকরণ (Reorganizaing the activities):
প্রতিষ্ঠানের কাজ, বিভাগ, দায়িত্ব-কর্তৃত্ব ও সংগঠন কাঠামো পুন:সংগঠিতকরণ নমণীয়তা দূরীকরণের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপায় । তবে এ কাজ অনেক সময় খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাড়ায়। জনশক্তি অনেকক্ষেত্রেই এর বিপক্ষে প্রবল বাধার সৃষ্টি করে। এজন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনলে ঐ পরিবর্তনের সাথে মিলিয়ে পুনঃসংগঠিতকরণের কাজ সেরে নেয়া সুবিধাজনক । এক্ষেত্রে করণীয় হতে পারে-
i) নতুন প্রতিষ্ঠান ক্রয় করে পূর্ববর্তী কাজের সাথে সমন্বয়সাধন;
ii) পুরানো প্রতিষ্ঠানের অংশবিশেষ বিক্রয় করে নতুনভাবে কাজ সংগঠিতকরণ;
iii) পণ্যসারি পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজে নতুনত্ব সৃষ্টি;
iv) বাজারজাতকরণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে কাজে সমন্বয়সাধন ইত্যাদি ।
খ) মানসিক উন্নয়ন (Mental development) :
সংগঠনে নমনীয়তা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনশক্তিকে অনমনীয় মানসিকতা থেকে সরে এসে নমনীয়তা অর্জনের পক্ষে দাড়ানোর জন্য তাদের মানসিক উন্নয়ন সাধন করা আবশ্যক । এজন্য নিম্নোক্ত কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে:
i) নতুন মানসিকতাসম্পন্ন CEO নিয়োগ;
ii) ব্যবস্থাপকদের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ;
iii) ব্যবস্থাপকদের কর্তৃত্ব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি;
iv) ব্যবস্থাপকদের নতুন বিভাগ খুলে দায়িত্ব প্রদান;
v) নমনীয়তার প্রতি জনমত সৃষ্টি ইত্যাদি
৩. পদস্থ বা সহযোগী কর্মীদের কাজকে ফলপ্রদকরণ (Making staff work effective):
প্রতিষ্ঠানে সরলরৈখিক নির্বাহীদের সহযোগিতা করার জন্য পদস্থ বা সহযোগী কর্মীগণ কাজ করেন । উভয় ধরনের কর্মীরা যদি স্ব স্ব অবস্থানে থেকে সহযোগিতার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে তবে সেখানে কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায় পদস্থ কর্মীদের কোনো কর্তৃত্ব না থাকায় এবং কাজও সুনির্দিষ্ট না থাকার কারণে তারা প্রায়শই অবহেলিত হয় । এতে উভয় ধরনের কর্তৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার পরিবর্তে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায় । যা কার্যক্ষেত্রে সমস্যা ও অদক্ষতার সৃষ্টি করে । এজন্য নিম্নোক্ত কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করে সংগঠনকে কার্যকর করা যেভে পারে :
ক) দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুস্পষ্ট বর্ণনা;
খ) উভয় ধরনের নির্বাহীদের মানসিকতার উন্নয়ন সাধন;
গ) সহযোগিতার মধ্যেই সবার কল্যাণ-এ বিষয়ে উপলব্ধি সৃষ্টি;
ঘ) নৈতিক দায়-দায়িত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ; ঙ) পদস্থ কর্মীকে সকল বিষয় অবহিত রাখা;
চ) পদস্থ কর্মীর ব্যবহারকে সংগঠনের সাধারণ সংস্কৃতির অঙ্গ করে ফেলা ইত্যাদি ।
৪. দায়িত্ব-কর্তৃত্ব স্পষ্টকরণের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব দূরীকরব (Avoiding conflict by clarification of resporsibility & authority):
সংগঠন অকার্যকর হওয়ার পিছনে একটা অন্যতম কারণ হলো বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাহী ও কর্মীদের কর্তৃত্ব ও দায়-দায়িত্বের অস্পষ্টতা। একের কাজ অন্যে করতে যেয়ে ভুল বোঝাবুঝি ও জটিলতার সৃষ্টি হয় । এরূপ অবস্থা দূর করা না গেলে একসময় সংগঠন অকার্যকর হয়ে পড়ে । এজন্য নিম্নোক্ত কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে ।
ক) সংগঠন চিত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন;
খ) সংগঠন সারগ্রন্থ (Manual) তৈরি বা সংশোধন;
গ) পদ বর্ণনা (Position desuiption)-এর ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি পরিহার;
ঘ) কার্যক্ষেত্রে যোগাযোগ, সমন্বয় ও জবাবদিহিকরণের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা ইত্যাদি ।
৫. সংগঠন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিতকরণ (Ensuring understanding of organizing):
সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কাজের ধরন, ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ, আন্তঃসম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ও উৎসাহের অভাবেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায় । এ সকল বিষয়ে একের সাথে অন্যের ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বন্দ্ব হতে পারে । তাই কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় সংগঠন সম্পর্কে সংশ্লি সকলের ইতিবাচক স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা উচিত। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে ।
ক) জনশক্তির সামনে নিজস্ব সংগঠনের উদ্দেশ্য বা সংগঠন তাদের নিকট থেকে কী চায় তা সুস্পষ্ট করা:
খ) প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত সংগঠন কাঠামো সম্পর্কে সবাইকে ধারণা দেয়া;
গ) কোন বিভাগ ও উপবিভাগ কী কাজ করছে সেই সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি;
ঘ) নিজের বিভাগ বা উপবিভাগের কাজ ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা প্রদান;
ঙ) সংগঠনের কর্তৃত্বের বিভাজন, কর্তৃত্ব বণ্টন ও কর্তৃত্বের প্রয়োগ সম্পর্কে জানানো;
চ) বিভিন্ন বিভাগ ও উপবিভাগের কাজে সমন্বয়, জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণের পন্থা সম্পর্কে জ্ঞানদাল
ছ) আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংগঠন সম্পর্কে ধারণা প্রদান ও তার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানানো ইত্যাদি ।

৬. কার্যকর সাংগঠনিক সংস্কৃতির উন্নয়ন (Promoting an appropriate organization culture);
কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘস্থায়ী উপায়ের একটা অন্যতম উপায় হলো কার্যকর সাংগঠনিক সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধন করা । সংস্কৃতি হলো চিন্তা-বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও আচরণের সাধারণ ভাবধারা । একটা প্রতিষ্ঠানে এ ভাবধারা দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠে। আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজেকর্মে ঢিলে-ঢালা ভাব, লাল ফিতার দৈরাত্ব সবই আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। অন্যদিকে আমাদের দেশেই বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে কাজেকর্মে এক ভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে । তাই উত্তম সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হলে ব্যবস্থাপনার প্রতিটা কাজে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ।
