আজকের আলোচনার বিযয় নেতৃত্বের বিভিন্ন স্টাইল বা ধরন – যা নেতৃত্ব এর অর্ন্তভুক্ত, নেতৃত্ব কেমন হবে তা অধস্তনদের মান, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল । স্থান-কাল-পাত্র ভেদে প্রাচীনকাল হতেই বিভিন্ন সমাজে ও প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, চলে আসছে। নেতার ব্যক্তিগত চিন্তা, অভিমত, মূল্যবোধ ও কর্মকৌশলে পার্থক্য থাকায় নেতৃত্বের ধরনেও পার্থক্য সূচিত হয় ।
Table of Contents
নেতৃত্বের বিভিন্ন স্টাইল বা ধরন

উপরের রেখাচিত্রে বর্ণিত বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো :
ক) আনুষ্ঠানিকতা বিচারে (Basing on formalities);
১. আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Formal leadership) :
আনুষ্ঠানিক সংগঠন কাঠামোতে পদমর্যাদা হতে যে নেতৃত্বের সৃষ্টি হয় তাকে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব বলে। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসারেই এক্ষেত্রে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি অধস্তন জনশক্তির নেতা হিসেবে গণ্য হয় এবং তারা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকে । এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ববলেই ঊর্ধ্বতন অধস্তনদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করে । উদাহরণস্বরূপ-উৎপাদন ব্যবস্থাপক তার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাবলেই উৎপাদন বিভাগের কার্যাকার্যে নেতৃত্ব প্রদানের অধিকারী হন ।
২. অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Informal leadership) :
বৃহদাকার প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক জনগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এদের মধ্যকার গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জন্মস্থান, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ইত্যাদি পার্থক্যের কারণে তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়ে থাকে । এরূপ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক কোনো কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা না থাকলেও দলভুক্ত সদস্যদের ওপর তারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যে কোনো সৎ, বুদ্ধিমান ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সবাই সম্মান করতে পারে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ যেকোনো প্রয়োজনে উক্ত ব্যক্তির মতামতকে গুরুত্ব দিতে পারে। এক্ষেত্রে কোন সাংগঠনিক কর্তৃত্ব না থাকলেও উক্ত ব্যক্তি অনানুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের মর্যাদায় আসীন হয়েছে বলা যায় ।
খ) প্রেষণার ধরন বিচারে (Basing on types of motivation);
১. ইতিবাচক নেতৃত্ব (Positive leadership) :
যদি কোনো নেতৃত্ব অনুসারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ- সুবিধা ও পুরস্কার প্রদান, প্রয়োজনীয় উৎসাহ, পরামর্শ ও কাজের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের চেষ্টা করে তাকে ইতিবাচক নেতৃত্ব বলে । অধস্তন জনশক্তি শিক্ষিত, যোগ্য ও কর্মোদ্যোগী হলে এরূপ নেতৃত্ব কার্যক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে ।
২. নেতিবাচক নেতৃত্ব (Negative leadership) :
যে নেতৃত্ব অধস্তনদের ইতিবাচক প্রেষণাদানের পরিবর্তে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায় করে তাকে নেতিবাচক নেতৃত্ব বলে । এটি অনেকটা স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের অনুরূপ। দীর্ঘমেয়াদে এরূপ নেতৃত্ব কখনই ফলদায়ক হয় না । আধুনিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এরূপ নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য না হলেও অনেক ক্ষেত্রে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বিধান ও নিরুৎসাহী কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের ক্ষেত্রে এরূপ নেতৃত্ব সীমিত সময়ের জন্য হলেও ভালো ফল দেয় ।
গ) ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন বিচারে (Basing on types of using power):
১. স্বৈরতান্ত্রিক বা প্রভুত্বমূলক নেতৃত্ব (Autocratic leadership) :
এরূপ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নেতা সকল ক্ষমতা নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখে এবং নিজে ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এরূপ নেতৃত্ব সাধারণত নেতিবাচক হয় এবং এক্ষেত্রে কর্মীদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে কাজ আদায়ের চেষ্টা করা হয় । এরূপ নেতৃত্ব কৌশল নেতার জন্য সন্তুষ্টবর্ধক হলেও জনশক্তি সব সময়ই এরূপ নেতৃত্বকে অপছন্দ করে ।
২. পিতৃসুলভ নেতৃত্ব (Patternalistic leadership) :
প্রভুত্বমূলক বা স্বৈরাচারী নেতৃত্বের উন্নত সংস্করণই হলো পিতৃসূলভ নেতৃত্ব। এক্ষেত্রে নেতা ও অনুসারীদের মধ্যে পিতা ও সন্তানের সম্পর্ক লক্ষ করা যায় । নেতা এক্ষেত্রে অনুসারীদের প্রতি সদয় থাকে । অভাব-অভিযোগের প্রতি মনোনিবেশ করে এবং স্নেহ ও মমতার মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে কাজ আদায়ের চেষ্টা করে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সামন্ত প্রভুদের মনোভাবের উন্নততর বহিঃপ্রকাশ হতেই মূলত এ ধরনের নেতৃত্বের উৎপত্তি ।
৩. গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব (Democratic or participative leadership) :
এরূপ নেতৃত্ব স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিপরীত । অর্থাৎ এক্ষেত্রে সমগ্র ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রীভূত না রেখে নেতা প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব অধস্তনদের কাছে হস্তান্তর করে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধস্তনদের পরামর্শ গ্রহণ ও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এরূপ নেতৃত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে । এরূপ নেতৃত্বের অধীনে কর্মীদের মনোবল, নৈতিকতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় । তবে এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক সময় বিলম্ব হয় এবং অধস্তনদের সবাইকে সব সময় খুশী করা যায় না ।
৪. মুক্ত বা লাগামহীন নেতৃত্ব (Free-rein leadership) :
এরূপ নেতৃত্বের প্রকৃতি হলো এতে অধস্তনরা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে । এক্ষেত্রে নেতা কর্মবিমুখ হয় এবং অধস্তনদের কাছ থেকে নিজকে দূরে রাখে । এরূপ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নেতা শুধুমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয় কিন্তু লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার কোনো ভূমিকা থাকে না । অধস্তনরাই কার্যাকার্য নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায় । এরূপ নেতৃত্বের কার্যত কোনো সুবিধা নেই। এক্ষেত্রে অধস্তনরা নেতাকে কোনো মূল্য দেয় না । প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ সময়ই বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে এবং অনুসারীরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে ।
ঘ) দৃষ্টিভঙ্গি বিচারে (Basing on outlook)
১. কর্মকেন্দ্রীক নেতৃত্ব (Function oriented leadership):
যে নেতৃত্ব ধারাণায় কর্মীদের নিকট থেকে বেশি কাজ আদায়কেই নেতা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাকে কর্মকেন্দ্রীক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে কর্মীদের ভাল-মন্দ বিবেচনার চাইতে কাজ আদায়ের বিষয়টিই অধিক গুরুত্ব পায় । যে কারণে নেতৃত্ব অনেক সময় অধিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ বা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেও কাজ আদায়ের চেষ্টা করে ।
২. কর্মীকেন্দ্রীক নেতৃত্ব (Employee-oriented leadership) :
উৎপাদন বৃদ্ধিতে কর্মীদের ভাল-মন্দ বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে যে নেতৃত্ব কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাকে কর্মীকেন্দ্রীক নেতৃত্ব বলে । এরূপ নেতৃত্ব ধারণায় নেতা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যার্জনে কর্মীদের নিকট থেকে উত্তম সহায়তা লাভের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করে । কর্মকেন্দ্রীক নেতৃত্ব ধারণা অপেক্ষা এরূপ ধারণা আধুনিক বিবেচিত হয়ে থাকে ।
ঙ) প্রভাব সৃষ্টির বিচারে (Basing on creating influence) :
১. আদান-প্রদানমূলক নেতৃত্ব (Transactional leadership) :
নেতা ও অনুসারীদের মধ্যে সম্পর্ক একে অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে ঐ নেতৃত্বকে আদান-প্রদানমূলক নেতৃত্ব বলে। এক্ষেত্রে নেতা অধস্তনদের নিকট থেকে কাজ আদায়ে কাজের লক্ষ্য নির্দেশ করে, তাদের কার্য দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করে, তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগায় এবং তত্ত্বাবধান ও যোগাযোগের মাধ্যমে উদ্দেশ্যার্জনের চেষ্টা চালায় ।
২. রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব (Transformational leadership) :
রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব আদান-প্রদানমূলক নেতৃত্ব অপেক্ষা অগ্রসর মানের। এক্ষেত্রে নেতা শুধুমাত্র অধস্তনদেরকে উৎসাহিতই করে না এর বাইরেও তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা ও আগ্রহ জন্ম দেয়। এ ছাড়াও অধস্তনদের মধ্যে এমন বোধের সৃষ্টি হয় যে, তারা প্রতিষ্ঠানের মিশন বা লক্ষ্যকে নিজের মিশন বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে । ফলে তাদের মধ্যে কাজের সাথে একাত্মতার অনুভূতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় ।

৩. সম্মোহনী নেতৃত্ব (Charismatic leadership ) :
এরূপ নেতৃত্ব ধারণায় নেতা এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী থাকে যা অধস্তনদের মাঝে তার প্রতি বিশেষ এক ধরনের আস্থা ও প্রত্যাশার জন্ম দেয় । এরূপ নেতা প্রজ্ঞা ও বলিষ্ঠ কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে অনুসারীদের মাঝে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে যাতে তারা তাঁকে তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার নির্দেশ পালনকে জীবনের মিশন বা ধ্যান-জ্ঞান মনে করে থাকে । সাধারণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা এ ধরনের নেতৃত্ব লক্ষ করলেও ব্যবসা- বাণিজ্যসহ সমাজের সকল পর্যায়েই এ ধরনের নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে ।
