আজকের আলোচনার বিযয় নেতৃত্বের সমস্যা বা বাধা সৃষ্টিকারী উপকরণসমূহ – যা নেতৃত্ব এর অর্ন্তভুক্ত, উৎপাদনের উপকরণাদির মধ্যে মানবশক্তি পরিচালনা অত্যন্ত জটিল । অথচ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের এ জটিল উপাদান পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে অধস্তন জনশক্তি যেমনি সমস্যার সৃষ্টি করে তেমনি নেতার নিজস্ব দুর্বলতাও কার্যকর নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন দিকও অনেক সময় কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে । নিম্নে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধক রেখাচিত্রের সাহায্যে তুলে ধরা হলো:

Table of Contents
নেতৃত্বের সমস্যা বা বাধা সৃষ্টিকারী উপকরণসমূহ
উপরের রেখাচিত্রে প্রদর্শিত নেতৃত্বের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :
ক) নেতার নিজস্ব সমস্যা (Personal problems of a leader) :
নেতার নিজস্ব অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অনভিজ্ঞতা ও মানবীয় বিভিন্ন দুর্বলতা অনেক সময়ই কার্যকর নেতৃত্ব দানে সমস্যার সৃষ্টি করে । নিম্নে এমন কতিপয় সমস্যা তুলে ধরা হলো :
১. নেতৃত্বের অদক্ষতা (Inefficiency of leadership) :
বিশিষ্ট লেখক Keith Davis একজন নেতার জন্য কমবেশি তিন ধরনের দক্ষতার প্রয়োজনের কথা বলেছেন; কারিগরি দক্ষতা (Technical skill), মানব সম্পর্ক বিষয়ক দক্ষতা (Human relations skill) ও ধারণাগত দক্ষতা (Conceptual skill)। এরূপ দক্ষতার অভাবে একজন নেতা অনেকক্ষেত্রেই কার্যকর নেতৃত্ব দানে ব্যর্থ হন ।
২. অহমিকাবোধ (Vanity) :
নেতৃত্বের সঙ্গে ক্ষমতা সম্পর্কিত । উচ্চক্ষমতা ও পদমর্যাদা অনেক সময় নেতার মনে অহংবোধের সৃষ্টি করে । ফলে অধস্তনদের কথা ও কাজের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায় । এ পর্যায়ে নেতা স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়েন । যার ফলশ্রুতিতে নেতার প্রতি অধস্তনের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য হ্রাস পায় । যা কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বাধার সৃষ্টি করে ।
৩. ক্ষমতা প্রদর্শনের মনোভাব (Tendency to exhibit power) :
নেতার মনে ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা মানসিকতা অনেক সময় কাজ করে । এর ফলে প্রয়োজনাতিরিক্ত নির্দেশ দান, অধস্তনের কাজে অহেতুক হস্তক্ষেপ, অহেতুক হুমকি প্রদান, ভীতি সৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে নেতা কাজ আদায় ও নিজস্ব ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চান । যার ফলশ্রুতিতে অধস্তনদের মনোবলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে ।
৪. দায়-এড়ানোর প্রবণতা (Tendency to evade responsibility) :
কর্তৃত্বের সাথে দায়িত্ব সম্পর্কযুক্ত। অনেকক্ষেত্রেই নেতা কর্তৃত্ব ভোগ করতে চান কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতায় ভোগেন । এর ফলে নিজের দায়কে অধস্তনদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে অধস্তনদের কাছে নেতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় । অন্যদিকে ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা হারানোর ফলে নেতার পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দান সম্ভব হয় না ।
৫. নিরপেক্ষ মনোভাব সংরক্ষণে ব্যর্থতা (Failure to maintain neutrality) :
একজন নেতাকে সব সময়ই দলীয় মানসিকতার ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হয়। নেতা যদি অধস্তন সকলের সঙ্গে সমান আচরণ প্রদর্শনে ব্যর্থ হন, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন সে ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদান তার পক্ষে সম্ভব হয় না । যা যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে ।
৬. অতি আবেগ (Over emotion ) :
কোনো মানুষই আবেগের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একজন নেতাকে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তি ও বাস্তবতার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করতে হয়। অথচ পদমর্যাদাগত কারণেই নেতার মাঝে এক ধরনের আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। নেতৃত্বের সমালোচনা, আনুগত্যহীনতা বা অসহযোগিতা নেতাকে অনেকসময়ই অসহনশীল করে তোলে । এমতাবস্থায় নেতার পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দান সম্ভব হয় না ।
খ) অধস্তন জনশক্তির সমস্যা (Problems of followers ) :
অধস্তন বা অনুসারীদের মান, কর্মদক্ষতা, আনুগত্য ইত্যাদির মাধ্যমেই নেতার নেতৃত্ব বিকশিত হয়। একইভাবে অনুসারীদের অযোগ্যতা ও অন্যায় আচরণ কার্যকর নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । সুষ্ঠু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এরূপ সমস্যাসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. অধস্তনদের অদক্ষতা (Inefficiency of subordinates) :
অনুসারীরা যদি যোগ্য, আনুগত্যপরায়ণ ও কাজের প্রতি আন্তরিক হয় তবে নেতা সহজেই তাদের পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু অধস্তন জনশক্তির সবাই সবসময় এরূপ কাম্যমানের হবে এটা প্রত্যাশা করা যায় না । জনশক্তির অদক্ষতা ও অযোগ্যতা নেতৃত্বের জন্য অনেকসময়ই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. নেতৃত্বের প্রতি বিরূপ মনোভাব (Negative attitude towards leadership) :
নেতৃত্বের প্রতি অধস্তনদের মনোভাবের ওপরও কাজের ফলপ্রদতা নির্ভর করে । এরূপ মনোভাব ভালো হলে যেমনি নেতৃত্ব ফলপ্রসূ হয় তেমনি মনোভাব নেতিবাচক হলে নেতৃত্ব সফলতা লাভ করতে পারে না। অনুসারীরা অনেক সময়ই তাদের স্বার্থের বিষয়ে নেতৃত্বকে সন্দেহ করে, যা নেতৃত্বদানে সমস্যার কারণ হয় ।
৩. ফাঁকিবাজির মানসিকতা (Mentality of avoiding work) :
অধস্তন জনশক্তির মধ্যে ফাঁকিবাজির একটা মানসিকতা সবসময়ই কাজ করে । বিশিষ্ট আচরণ বিজ্ঞানী Douglas McGragor তাঁর Theory X’-এ মনুষ্য প্রকৃতির এ বিষয়ে আলোচনা তুলে ধরেছেন। আমাদের সমাজেও এ অবস্থা সাধারণভাবেই পরিলক্ষিত হয়। অধস্তনদের মধ্যে এরূপ প্রবণতা বেশি থাকলে কার্যকর নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে তা নেতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
৪. নেতার প্রতি অতি নির্ভরশীলতা (Too much dependence on the leader)
নেতার প্রতি অধস্তনদের অতি আস্থা ও অতি নির্ভরশীলতাও নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি করে । নেতার প্রতি অধস্তনদের অতি নির্ভরতার সৃষ্টি হলে সেক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব এড়াতে চায় এবং নেতার প্রতি অতি আস্থার ফলে নিজের ওপর আস্থা হারায়। এরূপ অবস্থায় সকল কাজের দায়-দায়িত্ব ও চাপ নেতার ওপর পড়ে; যা নেতৃত্বকে বিপর্যস্ত করে ।
৫. আকস্মিক অসহযোগ (Sudden disobedience) :
অধস্তনদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ও আনুগত্য নেতার শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে এরূপ সহযোগিতা ও আনুগত্য সব সময় বজায় রাখা নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব হয় না । কোনো কারণে আনুগত্যহীনতা ও অসহযোগ সৃষ্টি হলে অনেক সময়ই তা ব্যাধির আকারে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । যা থেকে পরিত্রাণ লাভ কষ্টসাধ্য হয় । এটিও নেতৃত্বের জন্য একটি সমস্যা।
৬. বিশেষ আনুকূল্য লাভের চেষ্টা (Effort to gain special favour) :
অধস্তনদের অনেকের মধ্যে নেতা বা নির্বাহীর বিশেষ আনুকূল্য লাভের চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। ফলে অনেকে মোসাহেবির বদৌলতে নেতার নেকনজরে আসে। অন্যদিকে আরেকদল নেতাকে সন্দেহ করে এবং নেতার বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় । এতে গ্রুপিং-লবিং সৃষ্টি হয় । যাও নেতৃত্বকে সমস্যাগ্রস্ত করে তোলে ।
গ) প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা (Institutional problems ) :
কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এবং নিয়ম-নীতিও অনেক সময় বাধার সৃষ্টি করে । অপর পৃষ্ঠায় এরূপ সমস্যাবলি তুলে ধরা হলো :
১. উপকরণাদির অপর্যাপ্ততা (Inadequate factors) :
নেতৃত্ব সফল হওয়ার ক্ষেত্রে উপকরণাদির
প্রয়োজনীয় সমর্থন (Logistic support) থাকা অপরিহার্য। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনশক্তি, পর্যাপ্ত মূলধন, উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা, কার্যকর হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানে থাকলে নেতৃত্ব দান সহজ হয় । কিন্তু যদি উপায়-উপকরণের সীমাবদ্ধতা থাকে তবে সেক্ষেত্রে নেতৃত্বকে পদে পদে সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় ।
২. পরিবেশগত বাধা (Environmental obstacle) :
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ওপর নেতৃত্বের সফলতা নির্ভর করে । প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যদি কাঙ্ক্ষিত না হয়, শ্রমিক-ব্যবস্থাপনার মধ্যে যদি বিরোধ লেগে থাকে ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-শৃঙ্খলা যদি স্বাভাবিক নেতৃত্বদানের অনুকূল না হয় তবে সেক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব দান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে ।

৩. নেতা নির্বাচনে সমস্যা (Problems in selecting leader) :
নেতা নির্বাচনও কার্যকর একটি বড়ো সমস্যা। নেতৃত্ব যোগ্য ব্যক্তিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোসাহেবি করতে চায় না। প্রতিষ্ঠায় অথচ মালিকপক্ষ বা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ ‘খয়ের খাঁ’ লোকদেরকেই সামনের কাতারে দেখতে চায়। ফলে অযোগ্য ব্যক্তি নেতা নির্বাচিত হয় । প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কারণেও অনেক সময় অযোগ্য সিনিয়র ব্যক্তি নেতৃত্বে আসে; যা সমস্যার কারণ হয় ।
৪. সাংগঠনিক কাঠামোগত জটিলতা (Complexity of organizational structure) :
সাংগঠনিক কাঠামো জটিল এবং অস্পষ্ট হলেও তা কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে । নেতা যদি তার দায়িত্ব-কর্তব্য এবং কর্তৃত্ব-ক্ষমতা সম্পর্কে অস্পষ্টতায় ভোগেন সেক্ষেত্রে তার পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দান সম্ভব হয় না । ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ও বিকেন্দ্রীভূত হওয়ার ওপরও নেতৃত্বের কার্যকারিতা নির্ভর করে।
উপসংহারে বলা যায়, কার্যকর নেতৃত্বদানে উপরোক্ত বিভিন্নমুখী সমস্যা সব সময়ই অন্তরায় সৃষ্টি করে । এ সকল সমস্যা সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে যিনি লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে পারেন তার পক্ষেই যোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ সম্ভব হয় । যে কারণে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিকারী উপাদান বা সমস্যাসমূহ সব সময়ই নজরে রেখে সতর্কতার সঙ্গে নেতা বা নির্বাহীদের পথ চলতে হয় ।
