বিকেন্দ্রীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ

আজকের আলোচনার বিযয় বিকেন্দ্রীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ – যা কর্তৃত্বাপণ ও বিকেন্দ্রীকরণ এর অর্ন্তভুক্ত, যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এরূপ মাত্রা বেশি হলে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের ওপর শীর্ষ নির্বাহীর কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। ফলে কার্যক্ষেত্রে সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় জটিলতা দেখা দেয় ।

বিকেন্দ্রীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ

 

বিকেন্দ্রীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ

 

অন্যদিকে কেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হলে সব কাজেই সিদ্ধান্তের জন্য শীর্ষ নির্বাহীর দিকে চেয়ে থাকতে গিয়ে অধীনস্থ বিভাগসমূহের কাজে ও পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেয়। তাই এ সকল সুবিধা- অসুবিধার বিবেচনাতেই প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের ভারসাম্যাবস্থা নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপের প্রয়োজন পড়ে । এরূপ অবস্থা নিরূপণে যে সকল বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. শীর্ষ নির্বাহী ও কর্মকেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব (Gap between top executive & work centre) :

বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কেমন হবে তা নির্ধারণে শীর্ষ নির্বাহী ও কর্মকেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় । প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোতে স্তর (Hierarchy)-এর সংখ্যা বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে কর্মকেন্দ্রের দূরত্ব বেড়ে যায় । ফলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে । আবার যে বিভাগের কাজ কেন্দ্র হতে দূরে বিস্তৃত থাকে সেখানে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু যে বিভাগ শীর্ষ নির্বাহীর একেবারে কাছে সেখানে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কম হলেও চলে ।

২. অধস্তন নির্বাহীদের জ্ঞান ও দক্ষতা (Knowledge and skill of lower-level executives) :

যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তার তা গ্রহণের মতো জ্ঞান ও যোগ্যতা রয়েছে কি না তাও বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় । অধস্তন নির্বাহীগণ যদি জ্ঞানে ও দক্ষতায় যোগ্য হয়, তারা যদি প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ও অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে সমর্থ হয়, সেক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হতে পারে । কিন্তু অধস্তন নির্বাহীগণ যদি অযোগ্য ও অদক্ষ হয় তবে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না ।

৩. প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি ও কাজের ধরন (Nature of organization and its function) :

আয়তনভেদে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ছোট ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামোতে স্তরের সংখ্যা ও নির্বাহীর সংখ্যা কম হওয়ায় বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কম হলেও চলে । কিন্তু প্রতিষ্ঠান যতো বড় হয় স্তর ও নির্বাহীর সংখ্যা ততো বাড়ে এবং কাজের সুবিধার্থেই বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বাড়াতে হয় । এছাড়া কাজ জটিল হলে সেখানে কাজ চলাকালীন নানান প্রয়োজনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহীত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। ফলে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হয় ।

৪. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আবশ্যকতা (Necessity of taking quick decision) :

যে সকল প্রতিষ্ঠানে বা প্রতিষ্ঠানের যে সকল বিভাগে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয় সে সকল প্রতিষ্ঠানে বা বিভাগে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা অধিক হওয়া বাঞ্ছনীয় । আবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে বা এর কোনো বিভাগে স্থায়ী পরিকল্পনার আওতায় স্বাভাবিক ধারায় কার্য পরিচালিত হয় তবে সেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের তেমন প্রয়োজন হয় না । ফলে সেখানে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কম হতে পারে ।

 

৫. সিদ্ধান্তের ফলাফল (Result of decision) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া প্রতিষ্ঠানে কী হতে পারে বিকেন্দ্রীকরণের পূর্বে তাও বিবেচনা করা উচিত। প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির ভার যদি স্ব-স্ব বিভাগের ওপর দেয়া হয় তবে তা প্রতিষ্ঠানে বড়ো ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে । তাই এরূপ সিদ্ধান্তের বেলায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণই উত্তম । তবে উৎপাদন বিভাগের জন্য পূর্ব নির্ধারিত পরিমাণ কাঁচামাল কখন ও কীভাবে সংগ্রহ করা হবে এতদসম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার উৎপাদন বিভাগের কাছে দেয়া যেতে পারে ।

৬. সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা (Necessity of co-ordination) :

বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্ধারণে বিভিন্ন বিভাগের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনের অপরিহার্যতার বিষয়টিও বিবেচ্য। যদি সমন্বয় সাধনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হতে পারে না । যেমন- প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন টার্গেট কত হবে এটা নির্ধারণের ভার উৎপাদন বিভাগের ওপর না ছেড়ে সমন্বয়ের স্বার্থেই এরূপ টার্গেট নির্ধারণের কর্তৃত্ব উচ্চনির্বাহীদের কাছে থাকাই উত্তম । এতে সকল বিভাগের সমর্থন লাভ সম্ভব হয় । সমন্বয় এত গুরুত্বপূর্ণ না হলে এরূপ মাত্রা বেশি হতে পারে ।

৭. শীর্ষ নির্বাহীর যোগ্যতা ও মনোভাব (Quality and attitude of the top executive) :

বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্ধারণে শীর্ষ নির্বাহীর যোগ্যতা ও মনোভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় । শীর্ষ নির্বাহী যদি অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হন এবং সব সময় সিদ্ধান্ত দিয়ে অধস্তন নির্বাহীদের সঠিকভাবে চালিয়ে নিতে পারেন তবে সেখানে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না । যদি শীর্ষনির্বাহীর যোগ্যতা এ মানের না হয় তবে যতদূর সম্ভব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করাই উত্তম এবং সেক্ষেত্রে মাত্র কম হওয়া

৮. বিকেন্দ্রীকরণের প্রতি অধস্তন নির্বাহীদের মনোভাব (Attitude of lower executives to decentralization) :

বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উচ্চ নির্বাহীর মনোভাবই নয়, অধস্তন নির্বাহীদের মনোভাবও বিবেচনা করা আবশ্যক। অধস্তন নির্বাহীগণ যদি কাজের প্রয়োজনেই তাদের স্ব-স্ব বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজেরা পাওয়ার প্রত্যাশা করে বা অধস্তন নির্বাহীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া আদায়ে যদি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে ভালো ফল পাওয়া যায় তবে সে ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণই উত্তম । আর এরূপ না হলে সেক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা স্বভাবতই কম হয় ।

৯. ব্যয় ও ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক (Relation between cost and performance):

বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে ব্যয়ের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে জড়িত। অধস্তনদেরকে যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব প্রদান করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মর্যাদাপূর্ণ পদে যোগ্য লোক নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজনীয় স্টাফ এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও জোগাড় করতে হয় । ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ে । যদি ব্যয়ের অনুপাতে সুবিধার পরিমাণ বেশি হয় তবে সেক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা বেশি হতে পারে । অন্যথায় তা কম হওয়া উচিত ।

 

বিকেন্দ্রীকরণে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ

 

১০. যোগাযোগ ব্যবস্থা (Communication network) :

সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সে বিষয়ে নির্বাহীর কাছে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য থাকতে হয় এবং প্রয়োজনে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজন পড়ে। প্রতিষ্ঠানে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল থাকলেই শুধুমাত্র এটা করা সম্ভব হয়। শীর্ষ নির্বাহী যদি অধস্তন নির্বাহীর কাজে সব সময় খোঁজখবর রাখতে পারেন, পরামর্শ দিতে পারেন, সিদ্ধান্ত দিয়ে কাজকে এগিয়ে নিতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাত্রা কম হতে পারে । তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এ ধরনের না হলে বাধ্য হয়েই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হয়।

Leave a Comment