বিভাগীয়করণের ভিত্তি / পদ্ধতি / প্রকারভেদ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। আধুনিককালে ব্যবসায়ের প্রকৃতি, ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাওয়ায় কার্য বিভাগীয়করণেও যথেষ্ট ভিন্নতা লক্ষ করা যায় । একই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যায়ে নানান সুবিধা বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতির প্রচলনও লক্ষণীয়। ব্যবস্থাপনা বিশারদগণ বিভাগীয়করণের ভিত্তি বা প্রকারভেদ নানানভাবে তুলে ধরেছেন । নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্য তা তুলে ধরা হলো :

Table of Contents
বিভাগীয়করণের ভিত্তি / পদ্ধতি / প্রকারভেদ
উপরোক্ত বিভিন্ন বিভাজন বিশ্লেষণ করলে বিভাগীয়করণের যে সকল সাধারণ ভিত্তি বা পদ্ধতি লক্ষ করা যায় তা নিম্নরূপ :
১. সংখ্যাভিত্তিক বিভাগীয়করণ
২.সময়ভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৩. কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৪. স্থান বা অঞ্চলভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৫. ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৬.প্রক্রিয়া বা যন্ত্রভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৭.পণ্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগীয়করণ
৮. মেট্রিক্স বিভাগীয়করণ
নিম্নে বিভাগীয়করণের বিভিন্ন ভিত্তি বা বিভাগীয়করণের প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো :
১. সংখ্যাভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by numbers) :
বিভাগীয়করণের প্রাচীনতম পদ্ধতি হলো সংখ্যাভিত্তিক বিভাগীয়করণ । কর্মী সংখ্যার বিবেচনায় বিভাগ খোলা হলে তাকে সংখ্যাভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে । এতে একজন নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপক বা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে কতজন কর্মচারী কাজ করবে তা ঠিক করা হয়। এবং কর্মীসংখ্যা বিবেচনায় বিভাগের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয় ।
অধুনা কিছুটা পরিবর্তিতরূপে হলেও সেনাবাহিনীতে সংখ্যার ভিত্তিতে ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড, কোম্পানি, প্ল্যাটুন ইত্যাদিতে ভাগ করা হয়। প্ল্যাটুনের দায়িত্বে থাকেন একজন প্ল্যাটুন কমান্ডার। এভাবে একটা ব্রিগেডের দায়িত্বে থাকেন একজন ব্রিগেডিয়ার। উৎপাদনধর্মী কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নিচের স্তরে শ্রমিকদেরকে অনেক সময় সংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করে তাদেরকে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে ন্যস্ত করা হয় ।
বর্তমানকালে সংখ্যাভিত্তিক বিভাগীয়করণের প্রচলন হ্রাস পাওয়ার পিছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে বলে Weinrich ও Koontz মনে করেন। প্রথমত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে এখন প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে। বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন; দ্বিতীয়ত সংখ্যাভিত্তিক গঠিত কার্যদল অপেক্ষা বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন লোকদের নিয়ে গঠিত দল অধিক দক্ষ; এবং তৃতীয়ত এ ধরনের বিভাগীয়করণ শুধুমাত্র সাধারণ * মানের প্রতিষ্ঠানের নিম্ন পর্যায়ে যেখানে ব্যাপক জনশক্তি কায়িক শ্রম প্রদান করে সেখানেই ব্যবহার সম্ভব |
২. সময়ভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by time) :
জনশক্তিকে সময়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করাকে সময়ভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে। এটিও বিভাগীয়করণের একটি প্রাচীনতম পদ্ধতি। সাধারণত প্রতিষ্ঠানের নিম্নস্তরে যেখানে অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত কারণেই স্বাভাবিক কার্যদিবসে চাহিদানুযায়ী কার্য সম্পাদন সম্ভব হয় না সেখানেই এরূপ বিভাগীয়করণ পদ্ধতি লক্ষ করা যায় ।
শিফট (Shift) ভিত্তিতে বিভাগীয়করণ এ ধরনের বিভাগীয়করণের উদাহরণ । আমাদের দেশে পাট ও বস্ত্রশিল্পের কোথাও কোথাও শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতি লক্ষণীয় । জনকল্যাণধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান; যেমন- হোটেল, সংবাদপত্র, হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতি লক্ষ করা যায় । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাতি, দিবা ও নৈশ শিফট ইত্যাদিও এ ধরনের বিভাগীয়করণ ।
এরূপ বিভাগীয়করণের সুবিধা হলো :
(ক) এক্ষেত্রে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার বাইরেও সেবা প্রদান করা সম্ভব হয়;
(খ) সার্বক্ষণিক কর্মপ্রক্রিয়া চালু রাখার প্রয়োজন হয় সে ধরনের প্রতিষ্ঠানে এরূপ বিভাগীয়করণ উত্তম; এবং
(গ) যে সকল ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় সেখানে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার বাইরেও এ সকল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মূলধনী ব্যয় কমানো যায়।
তবে এরূপ বিভাগীয়করণের অসুবিধা হলো;
(ক) সকল শিফটে বিশেষত রাতের শিফটে প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধান সম্ভব হয় না;
(খ) কোনো কোনো শিফটে ক্লান্তি বেশি লাগে যা এড়ানো সম্ভব নয়; এবং
(গ) বিভিন্ন শিফটের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে অসুবিধা হয় ।
৩. কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by function) :
কাজের ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক কাজকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করাকে কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে । বর্তমানকালে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয়করণের যে সকল ভিত্তি লক্ষণীয় তার মধ্যে কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ বহুল প্রচলিত । এক্ষেত্রে কাজের ওপর ভিত্তি করে সমজাতীয় কাজকে বিভিন্ন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। Weinrich ও Koontz বলেন, “Grouping activities in accordance with the functions of an enterprise is functional ..71 departmentation. বিভাগীয়করণ । অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের কার্যের ভিত্তিতে শ্রেণীবিন্যাসকৃত বিভাগীয়করণ হলো কার্যভিত্তিক
কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের ব্যবহারে যে সকল মনীষী সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন তার মধ্যে F. W. Taylor -এর নাম উল্লেখযোগ্য । তিনি বৃহদায়তন উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানের কাজকে সমজাতীয়তার ভিত্তিতে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে তার দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলেছেন । তিনি এ ধরনের সংগঠনের নাম দিয়েছেন ‘Functional Foremanship’.
কার্যভিত্তিক সংগঠন কাঠামোর একটি চিত্র নিম্নে দেওয়া হলো :

কার্যভিত্তিক. বিভাগীয়কণের সুবিধা হলো : (ক) এ ধরনের বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে সংগঠন কাঠামো অনেক সহজ হয় এবং প্রতিষ্ঠানের কাজের চিত্র বাস্তবে ফুটে ওঠে; (খ) প্রধান কার্যাবলির কর্তৃত্ব ও মর্যাদা এর মাধ্যমে গরিস্ফুটিত হয়; (গ) পেশাগত বিশেষজ্ঞতার নীতি এক্ষেত্রে অনুসৃত হয় এবং একই ধরনের কাজ করার কারণে কর্মীদের পক্ষে কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ সহজ হয়; এবং (ঘ) ঊর্ধ্বতনের পক্ষে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সহজ হয় । তবে এর অসুবিধা হলো; (ক) যে সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত থাকে সেখানে এ ধরনের বিভাগীয়করণ সম্ভব হয় না;
(খ) প্রতিষ্ঠানের ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভাগের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় এবং এক সময় সমন্বয়ে সমস্যা দেখা দেয়: (গ) এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের চেয়ে বিভাগীয় স্বার্থ অনেক সময় অধিক গুরুত্ব পায়; (ঘ) কর্মীরা একই বিভাগে একই ধরনের কাজ করায় অনেক সময় একঘেয়ে বোধ করে; এবং (ঙ) একই ধরনের কাজ শেখায় কর্মীর পক্ষে অন্যত্র পদোন্নতি লাভের বা চাকরি পাওয়ার সুযোগ খুবই কম থাকে ।
৪. স্থান বা অঞ্চলভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by territory) :
কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান বা অঞ্চলে বিস্তৃত থাকলে উক্ত স্থান বা অঞ্চল অনুযায়ী কাজ ভাগ করাকে অঞ্চলভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে। Weinrich ও Koontz বলেছেন, “Territorial departmentation is specially attractive to large scale firms or other enterprises whose activities are physically or geographically dispersed.” 72 অর্থাৎ আঞ্চলিক বিভাগীয়করণ বিশেষভাবে বড় ধরনের বা সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক ফলপ্রসূ যার কাজ ভৌগোলিকভাবে ও বাস্তব কারণেই বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়ানো থাকে। নিম্নে এ ধরনের বিভাগীয়করণের একটি চিত্র প্রদর্শিত হলো :

এ ধরনের বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে অঞ্চলসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাকার্যে সবচেয়ে গুরুত্ব লাভ করে । প্রত্যেক অঞ্চলের কার্যভার একেকজন ব্যবস্থাপকের ওপর ন্যস্ত করা হয় । কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে সমন্বয় ও যোগসূত্র বজায় রেখে উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায় ।
আঞ্চলিক বিভাগীয়করণের সুবিধা হলো; (১) এক্ষেত্রে স্থানীয় অবস্থার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা যায় এবং স্থানীয় অবস্থার আলোকে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়; (২) এরূপ বিভাগীয়করণের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের কাজের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়; (৩) এক্ষেত্রে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ নিজস্ব পরিসরে অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে । এতে তাদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটে; (৪) এরূপ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিভিন্ন সুবিধা; যেমন- সস্তা শ্রমিক ও কাঁচামাল,
স্থানীয় বাজার ইত্যাদি সুবিধা কাজে লাগানো যায় এবং (৫) এরূপ বিভাগীয়করণে উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ইত্যাদিও হ্রাস পায় । তবে এরূপ বিভাগীয়করণের অসুবিধা হলো; (১) অঞ্চলসমূহ পরিচালনার জন্য যে ধরনের যোগ্য ব্যবস্থাপকের প্রয়োজন পড়ে অনেক সময়ই তা পাওয়া যায় না; (২) অনেক সময়ই একেকটি অঞ্চলের কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে পৃথক সংগঠন কার্যত গড়ে তুলতে হয় এতে অধিক জনশক্তি নিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে ও এতে খরচের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং (৩) বিভিন্ন অঞ্চলের কাজে সঠিকভাবে পরিবীক্ষণ, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয় ।
৫. ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by customer) :
বিভিন্ন ধরনের ক্রেতা বা গ্রাহকদের পছন্দ-অপছন্দ, চাহিদা, রুচি ইত্যাদি এক ধরনের নয় । সে কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ খোলা হলে তাকে ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে। বিমান কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের জন্য ও মালামাল পরিবহনের জন্য পৃথক বিভাগ খুলে কার্যক্রম পরিচালনা করলে একে ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলা যায়। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিক্রয় বিভাগে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের জন্য আলাদা কাউন্টার খুলতে পারে । কোনো বিভাগীয় বিপণি শিশু, স্কুলের ছাত্রছাত্রী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং বয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ খুললে তাকেও ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলা যায়। একটি ব্যাংকের ঋণ বিভাগেও ক্রেতাভিত্তিক বিভাগীয়করণ করা যেতে পারে । নিম্নে চিত্রের সাহায্যে এরূপ বিভাগীয়করণ দেখানো হলো :

এরূপ বিভাগীয়করণের বড় সুবিধা হলো একই ধরনের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার কারণে এর প্রত্যেকটি বিভাগ বিশেষায়ণের সুবিধা লাভ করে। এতে বিশেষ ধরনের ক্রেতাদের অবস্থা বুঝে অধিক সুবিধা প্রদান করা যায়। ফলে ক্রেতারাও সন্তুষ্ট থাকে। এ ছাড়া একই ধরনের ক্রেতারা একই স্থানে ভিড় করায় তাদের মধ্যেও একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে । তবে এরূপ বিভাগীয়করণের অসুবিধা হলো, সর্বত্র এরূপ বিভাগ খোলা সম্ভব নয় । এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানে ক্ষেত্রবিশেষে এরূপ বিভাগ খোলা হলে সমজাতীয় বিভাগগুলোর মধ্যে ও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজের সঙ্গে এর সমন্বয়ে অনেক সময়ই সমস্যা দেখা দেয়।
৬. প্রক্রিয়া বা যন্ত্রভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by process or equipment) :
যে ক্ষেত্রে উৎপাদনের একটি পদ্ধতিগত ধারার অনুসরণ করা হয় বা একটি প্রক্রিয়ার অনুসরণের মাধ্যমে উৎপাদন কার্য সম্পাদিত হয় সেখানে প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত যন্ত্রপাতি ও মালামাল সমন্বয়ে পৃথক বিভাগ খোলা হলে তাকে প্রক্রিয়া বা যন্ত্রভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে। এরূপ বিভাগীয়করণ পদ্ধতি উৎপাদন বিভাগের জন্য উপযোগী।
Terry ও Franklin-এর মতে, “This (departmentation by process) is logical when the machines or equipment used require special skill for operating, or have technical facilities which trongly suggest a concentrated location.” 73 অর্থাৎ যেখানে এমন যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় যা পরিচালনার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে অথবা কারিগরি অবস্থাদির কারণেই একটি বিশেষ কেন্দ্রীভূত স্থানের প্রয়োজন হয় সেখানে প্রক্রিয়াভিত্তিক বিভাগীয়করণ পদ্ধতির ব্যবহার যুক্তিযুক্ত। আমাদের দেশে চিনিকল, বস্ত্রকল ইত্যাদি শিল্পে এরূপ বিভাগীয়করণ পদ্ধতি লক্ষণীয়। নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে এরূপ বিভাগীয়করণ পদ্ধতি দেখানো হলো :
এ ধরনের বিভাগীয়করণের সুবিধা হলো; (১) এ ধরনের বিভাগীয়করণ বিশেষায়ণে বিশেষ সাহায্য করে। ফলে কর্মীদের পক্ষে দক্ষতা অর্জন সহজ হয়; (২) এর ফলে অবিরাম উৎপাদন কার্যধারা বজায় থাকে এবং (৩) কর্মীরা একই ধরনের কাজ করায় পণ্যমানের গুণগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়। তবে অসুবিধা হলো; (১) এক বিভাগের অসুবিধা বা অদক্ষতা অন্য বিভাগের দক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলে ও (২) কর্মীরা সম্পূর্ণ উৎপাদনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় ।
৭. পণ্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগীয়করণ (Departmentation by product or service):
যে সকল প্রতিষ্ঠান একাধিক পণ্য বা পণ্যরেখা উৎপাদন বা বিক্রয় করে অথবা বিভিন্নমুখী সেবা প্রদান করে; সে সকল প্রতিষ্ঠান পণ্য বা পণ্য রেখার ভিত্তিতে বা সেবার শ্রেণীভেদে বিভাগ খুলতে পারে। এরূপ বিভাগীয়করণকে পণ্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগীয়করণ বলে । টেরি ও ফ্রাংকলিন এর মতে, “Departmentation by product places all the resources and authority under one manager to get a product or service produced and marketed. “74 অর্থাৎ দ্রব্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ কোনো দ্রব্য বা সেবার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কাজকে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় সকল সম্পদ ও কর্তৃত্বকে একক বিভাগ বা ব্যবস্থাপনার অধীনে আনয়ন করে ।

এ ধরনের বিভাগীয়করণ সাধারণত বড় উৎপাদধর্মী ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের একটি সম্প্রসারিত রূপ । পণ্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগ খোলার পর এক্ষেত্রে পুনরায় প্রত্যেক বিভাগের অধীনে কাজের ভিত্তিতে বিভাগ খোলা হয়ে থাকে । ফলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ওপর স্ব-স্ব বিভাগের কর্তৃত্ব থাকে ।
তাই Trewatha ও Newport বলেন, “Product departments are generally independent of one another and are responsible for their own sales and production activities. “75 অর্থাৎ পণ্যভিত্তিক বিভাগীয়করণ সাধারণত একটি থেকে অপরটি স্বতন্ত্র এবং এর প্রত্যেকের নিজস্ব বিক্রয় ও উৎপাদন কাজের জন্য আলাদাভাবে দায়বদ্ধ থাকে । শুধুমাত্র উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানেই নয় সেবাধর্মী বা বিক্রয়ধর্মী প্রতিষ্ঠানেও দ্রব্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগ খোলা যায় ।
বিভাগীয় বিপণি দ্রব্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের একটি রূপ । পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের সেবার ধরন; যেমন- পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভাগ খুলতে পারে। নিম্নে পণ্য বা সেবাভিত্তিক বিভাগীয়করণের একটি নমুনা নিম্নে তুলে ধরা হলো :

এরূপ বিভাগীয়করণের সুবিধা হলো : (১) এরূপ বিভাগীয়করণে একজন নির্বাহী বা কর্মী একটি পুরো পণ্য বা পণ্যরেখা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে; (২) পণ্য বা সেবাভিত্তিক ভিন্ন বিভাগ খোলায় প্রত্যেকটি বিভাগের কাজে সমন্বয় সাধন ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়; (৩) এতে নির্দিষ্ট বিভাগকে তার ভালো-মন্দ কাজের জন্য দায়ী করা যায় ও পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য বা সেবা বিভাগের মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং (৪) একটি বিশেষ পণ্য বা সেবাকে কেন্দ্র করে বিভাগীয় কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় পণ্য বা সেবার মান বাড়ে ।
তবে অসুবিধা হলো: (১) প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদি বিভাগ খুলতে গিয়ে অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়; (২) যে ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবাকে কেন্দ্র করে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ খোলা যায় না ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগের কাজ সমন্বয়ে অসুবিধা দেখা দেয় এবং প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পরিকল্পনা, বাজেট ও হিসাব সংরক্ষণ কার্য পরিচালনা করায় ঊর্ধ্বতনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়।
৮. মেট্রিক্স বিভাগীয়করণ (Matrix departmentation) :
কার্যভিত্তিক ও দ্রব্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের সমন্বয়ে ১৯৬০ সালের পরে এক ধরনের নতুন বিভাগীয়করণ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে যাকে মেট্রিক্স বিভাগীয়করণ নামে অভিহিত করা হয় । বর্তমানকালে আধুনিক বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নত কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে কাজের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে ।
ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানে প্রচলিত বিভাগীয়করণ পদ্ধতিগুলো সমর্থ হচ্ছে না। তাই নমনীয়তা অর্জনের প্রয়াসে এরূপ নতুন ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে । John F. Mee এ সম্পর্কে বলেছেন, প্রাথমিকভাবে এরূপ সংগঠন এরোস্পেস (Aerospace) শিল্পে ব্যবহার শুরু হয় ।
পরবর্তী সময়ে ডো কর্নিং, জেনারেল ইলেকট্রিক, শেল অয়েল এবং অন্যান্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এর ব্যবহার লক্ষ করা যায় 176 মেট্রিক্স বিভাগীয়করণ হলো মূলত দ্রব্য ও কার্যভিত্তিক বিন্যাসের একটি মিশ্র রূপ। R. M. Hodgetts এ সম্পর্কে বলেছেন, “A matrix organization is a blend of functional and product (and in some cases territorial) departmentalization in which there is a dual command system that emphasizes both inputs and outputs. ” অর্থাৎ মেট্রিক্স সংগঠন হলো কার্যভিত্তিক ও দ্রব্যভিত্তিক (কখনও অঞ্চলভিত্তিক) বিভাগীয়করণের মিশ্রণ যেখানে দ্বৈত কর্তৃত্ব কার্যকর থাকে যা প্রয়োজনীয় যোগান (Input) ও উৎপাদন (Output)-এর ওপর পৃথকভাবে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে ।এ ধরনের সংগঠনের বৈশিষ্ট্য হলো-এক্ষেত্রে দু’ধরনের কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে কাজ করে।
যাদের একদল প্রয়োজনীয় জনশক্তি, উপায় উপকরণ ও সেবা প্রদান করে । এদের কার্যিক ব্যবস্থাপক (Functional manager) বা মালামাল ব্যবস্থাপক (Resource manager) বলা হয় । আরেকদল কর্তৃপক্ষ বিশেষ দ্রব্য বা প্রজেক্টের সামগ্রিক দায়িত্ব নেয় । এদেরকে বলা হয় প্রজেক্ট ব্যবস্থাপক (Project manager) বা ব্যবসায় ব্যবস্থাপক (Business manager)। প্রজেক্ট ম্যানেজার তার নির্দিষ্ট প্রজেক্টের সফলতা ও অসফলতার জন্য ঊর্ধ্বতনের কাছে দায়ী থাকে ।
এতে কার্যিক ব্যবস্থাপক ফাঁকি দেওয়ার কোনোই সুযোগ পায় না কারণ প্রজেক্ট ম্যানেজার সবসময়ই তার কাজ আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে প্রজেক্ট ম্যানেজারেরও এক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই কারণ তাকেই তার প্রজেক্টের কার্যকারিতার জন্য জবাবদিহি করতে হয় । এতে এক ধরনের দ্বৈত অধীনতা বা আদেশদানের দ্বৈত পদ্ধতি (Dual command) সৃষ্টি হয়। নিম্নে রেখাচিত্রের সাহায্যে এরূপ সংগঠন বা কার্য বিভাগ তুলে ধরা হলো :

এ ধরনের সংগঠনে সাধারণ ব্যবস্থাপক কার্যত মেট্রিক্স ব্যবস্থাপক হিসেবে গণ্য হন । তার অধীনে একদিকে থাকে বিভিন্ন কার্যিক ব্যবস্থাপক ও অনদিকে প্রজেক্ট বা দ্রব্য ব্যবস্থাপকগণ । প্রজেক্ট ব্যবস্থাপকগণ প্রজেক্টের জন্য তার কাছে দায়ী থাকে অন্যদিকে কার্য বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপক তার কাজের জন্যও সাধারণ ব্যবস্থাপকের কাছে দায়ী থাকে।
উভয় ধরনের ব্যবস্থাপকদের পারস্পরিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে আপনা-আপনি কাজের মধ্যে এক ধরনের গতির সঞ্চার হয় । কার্যক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সহজেই উক্ত সমস্যা মেট্রিক্স ব্যবস্থাপকের কাছে যায় এবং সে তদনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে অবশ্য সাধারণ বা মেট্রিক্স মানেজারকে যোগ্য এবং অধস্তনদের ওপর প্রভাবশালী হতে হয়।
অধস্তনদের প্ররোচিত বা উৎসাহিত করে কাজ আদায় করার স্বাভাবিক গুণও তার থাকা উচিত । মেট্রিক্স সংগঠন সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যায় না । যেখানে খুবই বিশেষজ্ঞ লোকেরা কাজ করে এবং বিশেষজ্ঞতাই কার্যক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় সেখানেই এ ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতি অধিক কার্যকর। নির্মাণ শিল্প, উচ্চ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন প্রস্তুত শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ ধরনের সংগঠন অধিক উপযোগী। (এরূপ বিভাগীয়করণের সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে হলে মেট্রিক্স সংগঠনের সুবিধা-অসুবিধা পড়তে হবে।)
