বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। কার্যকর বিভাগীয়করণ ছাড়া বর্তমান বৃহদায়তন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন সম্ভব নয় । বিভাগীয়করণের অনেকগুলো ভিত্তি বর্তমান। কোনো প্রতিষ্ঠান তার বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে কোন্ ভিত্তি ব্যবহার করবে তা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার যথাযথ বিবেচনার ওপর নির্ভর করে । সাধারণত প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বা বিভাগীয়করণের ভিত্তি বাছাইকালে যে সকল বিষয় বিবেচনা করা উচিত তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

 

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. বিশেষায়ণ অর্জন (Achieving specialization) :

বিশেষায়ণ বলতে কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানলাভকে বুঝায় । একজন কর্মী যদি কার্যক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে পারে তবে তার পক্ষে উক্ত কাজে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব । কার্য বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক বিভাগ ও উপবিভাগ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে যাতে বিশেষ জ্ঞান সম্বলিত হতে পারে বা বিশেষ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেতে পারে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন । কার্যভিত্তিক বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিশেষ কাজের জন্য বিশেষ বিভাগ খোলা হয় । বিক্রয় বিভাগের কাজকে অনেক সময় অঞ্চল ভিত্তিতে ভাগ করা হয় যাতে বিক্রয় কর্মীরা এলাকার স্থানীয় অবস্থা বিবেচনা করে বিশেষ জ্ঞান অর্জন ও তার প্রয়োগ ঘটাতে পারে।

২. নিয়ন্ত্রণে সুবিধা (Facility of control) :

প্রাতিষ্ঠানিক জনশক্তি ও উপায়-উপকরণকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাগে ভাগ করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেকটি বিভাগ যাতে নিজস্ব দায়িত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে । এর ফলে নিচের পর্যায় পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন, দায়-দায়িত্ব নির্দিষ্টকরণ, কার্যকর তত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।

এতে প্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় । তাই এমনভাবে প্রতিষ্ঠানের বিভাগগুলো খোলা উচিত যাতে প্রত্যেকটি বিভাগের দায়িত্ব নির্দিষ্ট হয় এবং অন্য বিভাগ থেকে এর ভিন্নতা সহজেই নজরে পড়ে। এতে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা হ্রাস পায় এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করা যায় ।

৩. সমন্বয়ে সহায়তা (Aid in co-ordination) :

কার্য বিভাগীয়করণে সমন্বয়ের বিষয়টিও খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত । প্রতিষ্ঠানে যতো বেশি বিভাগ, উপবিভাগ খোলা হয় ততোই প্রত্যেক বিভাগ পৃথক স্বকীয়তা লাভ করে । ফলে অসাম্য বা ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেয় । তাই বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে – সমন্বয়ের বিষয়টি সবসময়ই অধিক গুরুত্ব লাভ করে।

ট্রিওয়াথা ও নিউপোর্ট-এর প্রতিই আলোকপাত করে বলেন, “Work that is divided must ultimately be brought back together, or grouped in some Imanner in order to obtain a better co-ordination. ”  অর্থাৎ কাজ ভাগ করা হলেও কার্যত তাকে আবার একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় অথবা এমনভাবে ভাগ করা হয় যাতে কাজের মধ্যে উত্তম সমন্বয় সাধন করা যায় ।

৪. যথাযথ মনোযোগ প্রতিষ্ঠা (Establishing adequate attention) :

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কাজের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কার্যসমূহকে এমনভাবে বিভাজন করা হয় যাতে প্রত্যেকটি বিভাগ প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনে কার্যকর মনোনিবেশ করতে পারে । সাধারণত উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বিভাগ ও বিক্রয় বিভাগ খোলা হয় । এর উদ্দেশ্য হলো দু’টো প্রধান কাজের প্রতি যাতে বিশেষ মনোনিবেশ করা যায়।

এভাবে প্রতিষ্ঠানে ক্রয়, শ্রমিক-কর্মী, অর্থ ইত্যাদি বিভাগ প্রয়োজনে খোলা হয়ে থাকে । অর্থাৎ বিভাগ খোলার অর্থই হলো উক্ত বিভাগের বিশেষ প্রকৃতির কাজ বা অবস্থার প্রতি যথাযথ মনোযোগ আরোপ করা । তাই বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে এমনভাবে বিভাগগুলো খোলা উচিত যাতে এভাবে মনোযোগ আরোপ করা যায় ।

৫. স্থানীয় পরিস্থিতির স্বীকৃতি (Recognizing local conditions) :

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিস্থিতি বা বাস্তব অবস্থাও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় । একেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, উপায়-উপাদানের উপস্থিতি একই ধরনের নয় । এ ছাড়া বাহ্যিক পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্নধর্মী । তাই অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থার হুবহু অনুসরণ করে কার্যকর বিভাগীয়করণ সম্ভব নয়।

এজন্য অইরিক ও কুঞ্জ বলেছেন, “There is no best way to organize; the appropriate pattern depends on various factors in a given situation. These factors include the kind of job to be done, the way the task must be done, the kinds of people involved the technology. The people served and other internal and external consideration. ” অর্থাৎ সংগঠিত করার জন্য কোনো একক সর্বোত্তম পন্থা নেই; পরিস্থিতি বিশেষে উপযুক্ত সাংগঠনিক প্যাটার্ন কিরূপ হবে তা কতকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে । এসব বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে কী ধরনের কাজ করা হবে, কী পন্থায় কাজ করা হবে, উৎপাদন প্রযুক্তিতে কি ধরেেনর লোক জড়িত থাকবে, কাদেরকে সেবা প্রদান করা হবে ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিষয়াদি ।

 

৬. দক্ষতা অর্জন ( Achieving efficieney) :

বর্তমান যুগে কারবারি সফলতা অর্জনে দক্ষতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি উপায়-উপকরণকে যদি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো না যায় বা প্রত্যেকটি উপাদান কার্যক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয় তবে কখনই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জিত হতে পারে না । এরূপ দক্ষতা অর্জনে বিশেষায়ণের সুবিধা যেমনি থাকা প্রয়োজন তেমনি জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও থাকা আবশ্যক ।

তাই বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি কাজ ও উপায়-উপকরণকে এমনভাবে ভাগ করা উচিত যাতে প্রত্যেকেই স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে দক্ষতার সঙ্গে কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে । দক্ষতা বলতে কি বুঝাবে এ সম্পর্কে R. M. Hodgetts বলেছেন, “Efficiency means doing thing right. It is often measured by the equation “Output / input ” 80 অর্থাৎ দক্ষতা মানে হলো সঠিকভাবে কাজ করা। এটাকে সচরাচর উৎপাদন/ ব্যবহৃত উপকরণ-এ সমীকরণের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয় ।

৭. ব্যয় সংকোচ (Reducing costs ) :

বর্তমানকালে ‘Minimizing cost and maximizing profit যেকোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান লক্ষ্য। ব্যয় সংকোচ নির্ভর করে কত দক্ষতার সঙ্গে উপায়-উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে বা ব্যবহার করা যাচ্ছে তার ওপর। বিভাগীয়করণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কলেবর বৃদ্ধি পায় এবং যে কারণে ব্যয়ের পরিমাণও বেড়ে যায় ।

একটা বিভাগ খুললেই তার জন্য আলাদত জায়গা, আলাদা কর্মচারী, চেয়ার-টেবিলসহ নানান প্রয়োজন দেখা দেয় । অথচ বিভাগীয়করণ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সম্ভব হয় না। অইরিক ও কুঞ্জ তাই এ সম্পর্কে বলেন, “The grouping of activities and people into 1 departments makes organizational expansion possible”81 তাই বিভাগীয়করণের সময় ব্যয়ের দিকটা অর্থাৎ এর ফলে ব্যয় কী বাড়বে ও তা মুনাফার ওপর কী ইতিবাচক প্রভাব রাখবে তা বিবেচনা করা উচিত

৮. প্রতিযোগিতা সৃষ্টি (Creating competition) :

প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যদি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিরাজ করে তবে তা লক্ষ্যার্জনে অধিক কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। কার্যকর বিভাগীয়করণ এরূপ পরিবেশ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । উৎপাদন বিভাগ ও বিক্রয় বিভাগ পাশাপাশি খোলা হলে উৎপাদন বিভাগ চেষ্টা করবে যাতে কখনই বিক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত মালামালে ঘাটতি না পড়ে ।

আবার বিক্রয় বিভাগ চাইবে যেন কখনই উৎপাদিত পণ্যের মজুত সীমার অতিরিক্ত অবিক্রিত না থাকে । আঞ্চলিক ভিত্তিতে বিক্রয় বিভাগ খোলা হলে তা এমনভাবে ভাগ করতে হবে যাতে প্রতিটি বিক্রয় অঞ্চলের মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অবশ্য এরূপ প্রতিযোগিতা যেন কখনই পাস্পরিক রেষারেষির সৃষ্টি না করে সেদিকেও খেয়াল রাখা আবশ্যক ।

৯. নির্বাহীদের মনোবলের ওপর প্রভাব (Influence upon the morale of the executives) :

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে তা নির্বাহীদের মনোবলের ওপর বা স্বতঃস্ফূর্ত কর্ম প্রণোদনার ওপর কি প্রভাব বিস্তার করবে তাও বিবেচনা করা উচিত । বিভাগীয়করণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃতি ঘটে। বিভাগ-উপবিভাগসমূহ কর্তৃত্ব লাভের অধিকারী হয় ।

শুধুমাত্র কর্তৃত্ব নয় তা বিকেন্দ্রীকরণের পথও প্রশস্ত করে । তাই বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় নির্বাহীগণ কর্তৃত্ব প্রয়োগে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন তাও বিবেচনা করা উচিত । বিভাগ ও উপবিভাগ এমনভাবে খোলা উচিত যাতে প্রত্যেকের কাজ আলাদা হয় এবং ভারসাম্যাবস্থা বজায় থাকে এবং বিভাগীয় প্রধান যাতে তার বিভাগের কাজের ওপর পুরোমাত্রায় কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারেন ।

 

বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১০. বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা (Consideration of special condition) :

অনেক প্রতিষ্ঠানেই অবস্থাভেদে বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এরূপ অবস্থা মোকাবিলার জন্য তখন আলাদা বিভাগ খোলার প্রয়োজন পড়ে । এ জন্য এমনভাবে বিভাগীয়করণ করা উচিত যাতে প্রতিষ্ঠানে নমনীয়তা বজায় থাকে । প্রয়োজনে নতুন বিভাগ খোলা যায় ও পরবর্তী সময়ে তা গুটিয়ে নেওয়া যায় ।

সরকারি প্রশাসনে অনেক সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন পড়ে। বিভাগীয়করণের ক্ষেত্রে যদি তা পূর্বেই বিবেচনা করে প্রয়োজনে নতুন বিভাগ খোলা ও পরিচালনার সুযোগ রাখা হয় তবে উক্ত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা সহজ হয় । সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের বিভাগ খোলার ব্যবস্থা অনেক সময়ই রাখা হয়। মৌসুমী উৎপাদনধর্মী প্রতিষ্ঠানেও অনেক সময় বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশেষ বিভাগ খোলা হয়ে থাকে।

Leave a Comment