ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান / শক্তিসমূহ

ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান / শক্তিসমূহ এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” পরিবেশ” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবসায় পরিবেশ বলতে পরিবেশের এমন সব উপাদান বা শক্তিসমূহের সমষ্টিকে বুঝায় যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। পরিবেশগত এ সকল উপাদান ব্যবসায়িক কার্যক্রম তথা ব্যবসায় সংগঠনের গঠন, পরিচালনা, সিদ্ধান্ত, দক্ষতা, ফলপ্রদতা এবং সর্বোপরি এর সফলতাকে প্রভাবিত করে । তাই পরিবেশের এ উপাদানগুলোর সঠিক পরিচিতি এবং এদের প্রভাবের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় । নিম্নে ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান/শক্তিসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হলো : 

ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান / শক্তিসমূহ

 

ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান / শক্তিসমূহ | পরিবেশ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক উপাদান/শক্তি (Physical or Geographical elements/forces):

মানুষের চারপাশে যে সকল প্রাকৃতিক অবস্থা; যেমন- ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, মৃত্তিকা, উদ্ভিদজগত, প্রাণী জগত, খনিজ সম্পদ, জনগোষ্ঠি ইত্যাদি দেখা যায় তাদেরকে মিলিতভাবে পরিবেশের প্রাকৃতিক উপাদান বা শক্তি বলে । এ পরিবেশের উপাদানসমূহ মনুষ্য সৃষ্ট নয়- প্রকৃতির সৃষ্টি । পৃথিবীর যে দেশ বা অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে যত সমৃদ্ধ সে দেশ বা অঞ্চল শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে তত বেশি উন্নতি লাভ করেছে । অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অর্থনৈতিক উন্নতির শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে ।

২. অর্থনৈতিক উপাদান/শক্তি (Economic elements/forces) :

ব্যবসায় এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থনৈতিক পরিবেশের উপাদান বলতে সাধারণত সঞ্চয়, বিনিয়োগ, মূলধন, বাজার, . ভোগ, অর্থ ও ঋণ ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, মোট জাতীয় আয় ও উৎপাদন, জাতীয় আয়ের বণ্টন ইত্যাদির সমষ্টিকে বুঝায়।

এ সম্পর্কে Bovee ও তাঁর সহযোগীরা বলেন, “Economic forces involves the availability or scarcity of resources and the general economic trends that affect the organization.” অর্থাৎ অর্থনৈতিক শক্তির অন্তর্গত বিষয় হলো সম্পদের প্রাপ্তব্যতা অথবা দুষ্প্রাপ্যতা এবং অর্থনীতির সাধারণ ধারা-যা প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে। তাই, ব্যবসায়ের সফলতা অনুকূল অর্থনৈতিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। উন্নয়নশীল দেশে ব্যবসায়ের পশ্চাদপদতার কারণ অর্থনৈতিক পরিবেশের বিভিন্ন গুণকের নেতিবাচক প্রভাব ।

৩. সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান/শক্তি (Socio-cultural elements/forces) :

সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষের অভ্যাস, আচার-আচরণ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ-অনুভূতি, নৈতিকত মূল্যবোধ, রুচি-ফ্যাশন, শিক্ষা বা বুদ্ধিমত্তার স্তর, নগরায়ন ইত্যাদি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে Bovee ও তাঁর সহযোগীরা বলেন, “Socio-cultural forces are defined as the values, attitudes, needs and demographic characteristics of the society where organization operates.” অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান যেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করে সেখানকার সমাজের মূল্যবোধ দৃষ্টিভঙ্গি, চাহিদা এবং জনগোষ্ঠির বৈশিষ্ট্যাবলিই হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি । the

কোনো অঞ্চলে ব্যবসায় উদ্যম গড়ে উঠা না উঠার দায় ঐ অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উপর বর্তায় । একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে সেই দেশের সাংস্কৃতিক ধারার প্রতিক্রিয়া ব্যাখ্যা কর যায় । উন্নয়নশীল দেশে মানুষ সাধারণত ভাগ্যে বিশ্বাসী হয় এবং তারা কোনো কিছুর অর্জনকে ভাগ্যের প্রসন্নত এবং ব্যর্থতাকে ভাগ্যের বিপর্যয় বলে মনে করে ।

আবার দেখা যায়, সাংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে কোনে অঞ্চলের লোকেরা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাপনা পছন্দ করে, আবার ভিন্নতর সাংস্কৃতির লোকেরা অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থাপনা কৌশল পছন্দ করে। অর্থাৎ ব্যবসায়ের গঠন, পরিচালনা এবং সফলতায় সামাজিক ও সাংস্কৃতির পরিবেশের প্রভাব লক্ষণীয় বিষয় । সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ যত আধুনিক ও উদার হয় ব্যবসায় প্রচেষ্টাও তত গতিশীলতা লাভ করে ।

 

৪. রাজনৈতিক উপাদান/শক্তি (Political elements/forces) :

দেশের রাজনৈতিক পরিবেশও শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ, ব্যবসায়ের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপকীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। সরকারের স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক দলসমূহের মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি, নীতিমালা, কর্মসূচি, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এ সম্পর্কে P. Kotler and G. Armstrong বলেন, “The political environment consists of laws, government agencies and pressure groups tha influence and limit various organizations and individuals in a given society.” অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবেশ বিভিন্ন আইন, সরকারি সংস্থা এবং সংগঠিত বিভিন্ন সংঘের সমন্বয়ে গঠিত – যা কোন নির্দিষ্ট সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে এবং তাদের কার্যক্রমের সীমা নির্দেশ করে ।

৫. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উপাদান/শক্তি (Science and Technological elements / forces)

শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য প্রয়োজন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী, উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। তাই বর্তমান শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের উপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবেশের ভূমিকার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণভাবে। দেখা যায়, যে দেশ বিজ্ঞান চর্চা ও প্রযুক্তিতে যত বেশি অগ্রসর, ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা তত বেশি অগ্রগামী। এ Kotler & Armstrong 4, “Technological environment includes the forces that create new technologies, creating new product and market opportunities.” অর্থাৎ প্রযুক্তিগত পরিবেশ বলতে। এমন শক্তিসমূহকে বুঝায়-যা নতুন পণ্য এবং বাজার সুবিধা উন্মোচনের জন্য নতুন প্রযুক্তির সৃষ্টি করে।

৬. আইনগত উপাদান/শক্তি (Legal elements/forces):

রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে প্রণীত ও জারিকৃত বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতি-নীতি, সরকারি আদেশ-অধ্যাদেশ ইত্যাদির সমন্বয়ে দেশের আইনগত পরিবেশের সৃষ্টি। দেশে বিদ্যমান ব্যবসায় আইন, আয়কর আইন, মূল্য সংযোজন কর আইন, শ্রম আইন, ইত্যাদি আইন, বিধি- বিধান ও নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে ব্যবসায়ীদেরকে ব্যবসায় কার্য পরিচালনা করতে হয় । তাই রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান ইত্যাদিও ব্যবসায় কার্যকলাপের অন্যতম পরিবেশগত প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত ।

৭. আন্তর্জাতিক উপাদান/শক্তি (International elements/forces) :

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উত্থান, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের আন্তঃনির্ভরশীলতা, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, তথ্য প্রযুক্তি এবং পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি ব্যবসায়কে দেশের নির্দিষ্ট সীমার গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে ।

এর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটা দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ । তা ব্যবসায় কর্ম এবং এর পরিচালনাকে প্রভাবিত করছে। এ প্রসঙ্গে Donald A. Ball ও McCullark, “The international environment is essentially the interaction between the environment forces of the home country and those of the various foreign nations where the enterprise goes business.” অর্থাৎ স্বদেশ ও অন্যান্য দেশের যেথায় প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে সেখানকার পরিবেশগত শক্তিসমূহের অবশ্যম্ভাবী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই হলো আন্তর্জাতিক পরিবেশ । 

উপরোক্ত আলোচনার আলোকে নিমের রেখাচিত্রের সাহায্যে ব্যবসায় পরিবেশের উপাদানসমূহ তুলে ধরা হলো:

 

ব্যবসায় পরিবেশের উপাদান / শক্তিসমূহ | পরিবেশ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

পরিশেষে বলা যায়, ব্যবসায় সংগঠনের গঠন, কার্যকলাপ, সিদ্ধান্ত, ফলপ্রসূতা ইত্যাদি পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান বা শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয় । তাই সমাজ, রাষ্ট্র, অঞ্চল ইত্যাদি ভেদে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের গতি-প্রকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে । পরিবেশের উল্লেখিত উপাদানসমূহকে ব্যবসায় কার্যকলাপের উৎসাহ প্রদানকারী বা ইতিবাচক এবং বাধা প্রদানকারী বা নেতিবাচক উপাদান হিসেবেও চিহ্নিত করা যায় ।

Leave a Comment