সরলরৈখিক সংগঠনের অসুবিধা

সরলরৈখিক সংগঠনের অসুবিধা এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন” বিষয়ক পাঠের অংশ। সহজ ও সরল প্রকৃতির সরলরৈখিক সংগঠন ছোট ও সাধারণ মানের প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী হলেও মাঝারি ও বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য যে একেবারেই অনুপযোগী বর্তমানকালে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এরূপ সংগঠনের যে সকল অসুবিধা লক্ষ্য করা যায় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :

Table of Contents

সরলরৈখিক সংগঠনের অসুবিধা

 

সরলরৈখিক সংগঠনের অসুবিধা | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

 

১. বিশেষায়ণের অভাব (Lack of specialisation) :

বিশেষায়ণ বলতে কোনো নির্দিষ্ট কাজে সকল সামর্থ্য কেন্দ্রীভূত করাকে বুঝায়। সরলরৈখিক সংগঠন কাঠামোতে একজন নির্বাহীকে তার গণ্ডিতে সকল ধরনের কার্য সম্পাদন করতে হয় । ফলে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে যেয়ে একজন নির্বাহীর পক্ষে নির্দিষ্ট কার্য গণ্ডিতে সকল সামর্থ্য ব্যয় করা সম্ভব হয় না । ফলে কার্যক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞতা বা বিশেষায়ণের রীতি কার্যকর করা যায় না ।

২.সমন্বয়ে সমস্যা (Problems in co-ordination) :

প্রত্যেকটি বিভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকায় এরূপ সংগঠনে সাধারণ ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে বিভাগীয় কার্যে সমন্বয় বিধান করতে হয়। যা অনেক ক্ষেত্রে সময়সাপেক্ষ ও এটিল। এছাড়াও সকল বিভাগ অনেকটা আলাদা হওয়ায় পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠাতেও সমস্যা হয়। একটা উৎপাদন ইউনিটে মেশিন নষ্ট হলে তা যথানিয়মে উৎপাদন ব্যবস্থাপককে জানিয়ে তার মাধ্যমে মেরামত বিভাগের সহযোগিতা নিতে হয়। যা সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর।

৩. স্বৈরতন্ত্রের প্রতি ঝোঁক (Tendency towards autocracy) :

এ ধরনের সংগঠনে প্রত্যেক নির্বাহী নিজস্ব গন্ডিতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী ও অধস্তনদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বিবেচিত হয়। ঊর্ধ্বতনের সামনে ‘ভেজাবিড়ালের’ মতো থাকলেও অধস্তনদের সাথে ব্যাঘ্রের ন্যায় আচরণ করে। নিজস্ব পরিসরে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কারও সাথে তাকে পরামর্শ করার প্রয়োজন পড়ে না । ফলে স্বৈরতন্ত্রের প্রতি একটা স্বাভাবিক ঝোঁক প্রবণতা এরূপ সংগঠনে লক্ষ করা যায় ।

৪. নির্বাহীদের কার্যভার বৃদ্ধি (Increase in workload of executives) :

এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত স্বল্প সংখ্যক নির্বাহীকে তার গণ্ডিতে সকল কাজ সম্পাদন ও তার জন্য ঊর্ধ্বতনের নিকট দায়বদ্ধ থাকতে হয় । কাজের পরিধি বেশি হলেও সাংগঠনিক কারণেই কোনোরূপ সহযোগী কর্মী নিয়োগের সুযোগ এক্ষেত্রে থাকে না । ফলে নির্বাহী সব সময়ই অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে থাকে যা ফলপ্রদ কাজে বাধার সৃষ্টি করে।

৫. দক্ষ ব্যবস্থাপকের অভাব (Lack of efficient manager) :

বর্তমান প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যুগে একজনের পক্ষে একাধিক কাজ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। সরলরৈখিক সংগঠনে একজন বিভাগীয় প্রধানকে তার অধীন সকল কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে হয়। যা করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব । আর এরূপ কাজ করতে হলে যে মানের নির্বাহী প্রয়োজন তা সংগ্রহ করাও বর্তমানে বেশ জটিল বিষয় ।

 

৬. নির্বাহীর অনুপস্থিতিতে ক্ষতি (Loss due to the absence of executives) :

এ ধরনের সংগঠনে নির্বাহীকে সহযোগিতা করার কেউ থাকে না । ফলে কোনো কারণে যদি নির্বাহী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন তবে সমস্যা হয় । কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য উক্ত নির্বাহী না আসা পর্যন্ত বা কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় । ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মধারা ব্যাহত হয় এবং ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয় ।

৭. স্বজনপ্রীতি ও মোসাহেবি (Nepotism and flattery) :

একজন নির্বাহীকে এরূপ সংগঠনে অতিরিক্ত কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রদান করায় সে নিজ ইচ্ছামত অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। ঊর্ধ্বতনের নেক নজরের ওপর অধস্তনদের ভাল-মন্দ অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে। ফলে ঊর্ধ্বতনের পক্ষে স্বজনপ্রীতির সুযোগ ঘটে। তাই নির্বাহীকে ব্যক্তিগতভাবে খুশি করার জন্য একদল মোসাহেব বা তোষামোদকারীর সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র কিছু নয় ।

৮. মনোবল ও উদ্যমে নেতিবাচক প্রভাব (Negative influence on morale and team spirit) :

এ ধরনের সংগঠনে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, মোসাহেবি ইত্যাদির সম্প্রসারণ ঘটায় অনেক ক্ষেত্রেই অধস্তন কর্মীদের মনোবল ও উদ্যমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে; ফলে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় । এছাড়া অতিরিক্ত কর্মভারের কারণে নির্বাহীদের মনোবলেও অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।

য়তার অভাব (Lack of flexibility) :

এরূপ সংগঠনে সহযোগী বা বিশেষজ্ঞ কর্মী ব্যবহারের কোনো সুযোগ না থাকায় পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে সংগঠন পরিচালনার জন্য কোনো উদ্যোগ সামর্থ্যের অভাবে নতুন কর্ম ও চিন্তা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠান নমনীয়তার অভাবে ভোগে । গ্রহণ বা সুযোগ সৃষ্টি অনেক সময়ই কর্মব্যস্ত নির্বাহীর পক্ষে সম্ভব হয় না । সম্ভাবনা থাকলেও নির্বাহীর উদ্যোগ ও

গবেষণার অভাব এবং বিশেষজ্ঞ কর্মী ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় এরূপ সংগঠনের নির্বাহীদের পক্ষে কার্যক্ষেত্রের উৎকর্ষতা বিধানে কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না। ফলে উৎকর্ষবিহীন একঘেয়ে যথাযথ কাজ প্রতিষ্ঠানকে 

১০. কার্যক্ষেত্রে উৎকর্ষতা বিধানে সমস্যা (Problem in improving quality and standard) :

সংগঠনের নির্বাহীদের পক্ষে কার্যক্ষেত্রের উৎকর্ষতা বিধানে কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় না। 

১১. নির্বাহী নির্বাচনে সমস্যা (Problem of executive selection) :

এ ধরনের সংগঠনে একজন নির্বাহীকে তার অবস্থানে প্রয়োজনীয় সকল কাজ নিজেকেই সম্পাদন করতে হয়। ফলে যে গুণ বা মানের নির্বাহী নিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় তা সহজে পাওয়া যায় না । কোনো নির্বাহী কর্মস্থল পরিত্যাগ করলে বা নির্বাহী পদ শূন্য হলে তদস্থলে নতুন নির্বাহী নির্বাচন নিয়েও সমস্যা দেখা দেয় ।

১২. অধস্তনদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা (Excessive dependency on subordinates) :

এক্ষেত্রে নির্বাহী কর্মব্যস্ত থাকায় ও এককভাবে সকল বিষয়ে পর্যাপ্ত গুণ ও যোগ্যতাসম্পন্ন না হওয়ায় অধস্তনদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর তাকে অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের জন্য যা অনেক সময়ই ক্ষতিকর বিবেচিত হয়ে থাকে । 

 

সরলরৈখিক সংগঠনের অসুবিধা | সংগঠন কাঠামো এর শ্রেণিবিভাগ ও কমিটি সংগঠন | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১৩. জটিল ও বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানের অনুপযোগী (Inappropriate for complex and large-scale enterprise) :

বর্তমান বৃহদায়তন উৎপাদনের যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বড় ধরনের প্রতিষ্ঠান গঠন ও পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই । অথচ সরলরৈখিক সংগঠনের মাধ্যমে কখনই জটিল ও বড় ধরনের সংগঠন ।

Leave a Comment