সংগঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ

সংগঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। কার্যবিভাজন, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নির্দিষ্টকরণ ও অর্পণ এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের কাজকে সংগঠন বলে । ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় সংগঠন কার্য একটা যন্ত্র নির্মাণ বা কোনো কিছুর কাঠামো দাঁড় করানো সদৃশ।

সংগঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ

 

সংগঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

ইঞ্জিন তৈরিতে ভুল থাকলে গাড়ি চালানো যেমনি যায় না তেমনি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় সংগঠন কাজে ভুল করলে প্রতিষ্ঠান চালানো প্রতিটা পদে পদে সমস্যাসংকুল হয়ে পড়ে । তাই কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা বা শীর্ষ নির্বাহীদের এক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক । কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. কার্যবিভাজনে সমস্যা (Problem in division of work) :

কোন ভিত্তিতে কাজ ভাগ করা হবে, এটা নির্ণয় সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ । এই বিভাজনের ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বিক্রয় বিভাগে একই ধরনের বিভাগীয়করণের ভিত্তি ব্যবহার করা যায় না । বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে নানান ধরনের বিভাগীয়করণ পদ্ধতির নির্দিষ্টকরণে ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। সেই সাথে ভবিষ্যতে কাজ বাড়লে নতুনভাবে বিভাগীয়করণের প্রয়োজন হবে কি না তাও আগাম নির্ধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ।

২. সম্পর্ক স্থাপনে সমস্যা (Problem in establishing relationship) :

সংগঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম কাজ হলো বিভিন্ন ব্যক্তি ও বিভাগের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে কে কার অধীন, কে কার নিকট থেকে আদেশ পাবে, কার কাছে জবাবদিহি করবে, কর্তৃত্বের শৃঙ্খল, কর্তৃত্ব প্রবাহ, যোগাযোগ প্রবাহ কী হবে ইত্যাদি বিষয় এরূপ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর নির্ভর করে । সম্পর্ক যত সুষ্পষ্ট, প্রত্যক্ষ ও দৃঢ় হয় সংগঠন কাঠামো ততই মজবুত হয়ে থাকে । কিন্তু এই সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে নিরূপন অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বাধার সৃষ্টি করে ।

৩. ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয়ে সমস্যা (Problem in determining span of management) :

একজন ব্যবস্থাপকের সরাসরি তত্ত্ববধানে কতজন অধস্তন থাকবে তা নির্ণয়ও সংগঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । এরূপ পরিসর বড় হলে তত্ত্ববধানের মান দুর্বল হয় এবং ব্যবস্থাপক কার্যভারগ্রস্থ হয়ে পড়ে । আবার এরূপ পরিসর ছোট হলে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের সংখ্যা বাড়ে ও নির্বাহীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । এতে ব্যয় বাড়ে । আবার সকল ব্যবস্থাপকের যোগ্যতা, সময়, অধস্তনদের মান, কার্যপ্রকৃতি ইত্যাদি একই রূপ না হওয়ায় সর্বত্র কাম্য পরিসর নির্ণয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ।

 

৪. কর্তৃত্ব নিরূপণ ও অর্পণে সমস্যা (Problem in delegating authority) :

কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় প্রতিটা ব্যক্তি ও বিভাগের কাজ কী, দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সীমা কতদূর, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কোন পর্যায়ে কতটুকু দেয়া হবে, এ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে ভুল হলে তা প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের জটিলতা করে।

কারও কাজ বেশি কারও কাজ নেই, কাউকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কাউকে দেয়া হয়নি, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বন্টনে অস্পষ্টতা, কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণে মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থতা ইত্যাদি। যাতে না ঘটে কার্যকর সংগঠনে তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন পড়ে।

৫. অপ্রয়োজনীয় স্টাফ বা সেবা বিভাগের ব্যবহার (Use of unnecessary staff device or service department) :

একটা প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ স্টাফ নিয়োগ প্রয়োজন বা কার্যিক বিভাগকে সহযোগিতা করার জন্য কতটা সেবা বিভাগ খোলা দরকার কার্যকর সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তাও ভুলের বড় একটা ক্ষেত্র । একটা কলেজে অধ্যক্ষ নেই শিক্ষক নেই, কিন্তু অফিস কর্মচারী ও পিয়নে কলেজ ভর্তি- তাহলে প্রতিষ্ঠান চলবে না। উৎপাদন বিভাগ ও বিক্রয় বিভাগের সহযোগিতার জন্য পণ্য মান উন্নয়ন, বিক্রয় উন্নয়ন পণ্য মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সেবা বিভাগ খোলা হয়েছে । এক্ষেত্রে নানান বিভাগের কাজে সমন্বয়ে সমস্যা, পারস্পরিক ঠেলাঠেলি ইত্যাদি সমস্যার কারণ হতে পারে ।

৬. রৈখিক কর্তৃত্ব ও সহযোগী কর্তৃত্বের বিরোধ (Conflict between line authority and staff authority) :

বড় প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু কার্য পরিচালনায় রৈখিক নির্বাহীদের সহযোগিতা করার জন্য পদস্থ কর্মী বা সহযোগীর প্রয়োজন পড়ে । ফলে দু’ধরনের কর্তৃত্বের পাশাপাশি অবস্থান গড়ে ওঠে। রৈখিক নির্বাহী পুরো কর্তৃত্ব ভোগ করায় তার দ্বারা পদস্থ কর্মীর উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পারস্পরিক বিরোধও সৃষ্টি হতে পারে। তাই এরূপ ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ না করে অধিক সংখ্যায় পদস্থ কর্মীর ব্যবহার কার্যক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করে ।

৭. কার্যিক কর্তৃত্বের অপব্যবহার (Misuse of functional authority) :

কার্যিক কর্তৃত্ব বলতে কোনো নির্বাহীকে কোনো কাজ করার বিশেষ ক্ষমতা অর্পণকে বুঝায়। ব্যাংকের একজন শাখা ম্যানেজার শাখা পরিচালনা করেন। এখন কী পরিমাণ ঋণ ম্যানেজার নিজ কর্তৃত্ব বলে মঞ্জুর করতে পারলে তা কার্যিক কর্তৃত্বের সাথে সম্পর্কীত ।

এরূপ কর্তৃত্ব উর্ধ্বতন কর্তৃক প্রদত্ত হয় যা সময়ে সময়ে কম-বেশি করা যেতে পারে। এরূপ কর্তৃত্ব অধিক পেতে অধীনস্থ নির্বাহীরা আগ্রহী থাকে। যা দেয়া হলে তার অপব্যবহারের সম্ভাবনাও লক্ষ করা যায়। আবার এরূপ কর্তৃত্ব না দিলেও অধস্তন দিয়ে ঠিকভাবে কাজ করানো যায় না। তাই এক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম ও নির্দেশনার অনুসরণ না করে কর্তৃত্ব দিলে ভবিষ্যতে সমস্যা সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে ।

 

সংগঠনের ক্ষেত্রে সমস্যা বা ভুলের ক্ষেত্রসমূহ | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

৮. দ্বৈত-অধীনতার বিপদ (Danger of dual subordination ) :

একজন কর্মীকে যদি একাধিক ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ মানতে হয় তবে তাকে দ্বৈত-অধীনতা বলে । একটা প্রতিষ্ঠানের সংগঠন কাঠামো প্রতিষ্ঠাকালে সর্বত্র এ অবস্থা পরিহার করা সম্ভব হয় না । এছাড়া বর্তমানে বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠাসমূহের সংগঠন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে এক ব্যক্তি বা বিভাগ একাধিক ব্যক্তি বা বিভাগকে সেবা দেয় ও নির্দেশ পালন করে। তাই দ্বৈত-অধীনতার বিপদ যতটা সম্ভব যাতে এড়ানো যায় সে বিষয়টি সংগঠন প্রতিষ্ঠায় মাথায় রাখার প্রয়োজন পড়ে ।

Leave a Comment