গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ” বিষয়ক পাঠের অংশ। তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ধারণ প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রতিষ্ঠানভেদে বা প্রতিষ্ঠানের স্তরভেদে প্রত্যেক পরিসরে কর্মী সংখ্যা কত হবে তা নির্ধারণ খুবই জটিল বিষয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন চলকসমূহ (Variables) এতো বেশি প্রভাব ফেলে যার কারণে তাত্ত্বিকভাবে কোনো সূত্রের ভিত্তি করে পরিসর নির্ধারণ সম্ভব নয় ।

ওপর ব্যবস্থাপনা পরিসর কেমন হওয়া উচিত, এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা বিশারদদের মধ্যেও তীব্র মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায় । Weihrich ও Koontz যে ক্ষেত্রে উচ্চস্তরে একজন নির্বাহীর অধীনে ৪ হতে ৮ ও নিম্নস্তরে ৮ হতে ১২ জন কর্মী থাকার সুপারিশ করেছেন সেক্ষেত্রে কেউ কেউ উচ্চস্তরে ও নিম্নস্তরে ৬ জন কর্মী থাকার কথা বলেছেন । কেউ অবশ্য তত্ত্বাবধান স্তর নিচের দিকে ১৬ বা ২৪ পর্যন্ত রাখার কথা উল্লেখ করেছেন ।

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব

কাম্য ব্যবস্থাপনা পরিসর কী হওয়া উচিত এ সম্পর্কে কোনো সূত্র আবিষ্কৃত না হলেও পরিসর বড় বা ছোট হওয়ার কারণে ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর কর্মতৎপরতা বা তত্ত্বাবধান কার্যে তার কী প্রভাব লক্ষ করা যায় সে সম্পর্কে ১৯৩৩ সালে প্যারিসের ব্যবস্থাপনা পরামর্শক V. A. Graicunas তাঁর Relationship in Organization নামক একটা প্রবন্ধে সুন্দর আলোচনা তুলে ধরেন।

এই আলোচনাতে একজন নির্বাহীর অধস্তন কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাসের ফলে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের পরিধির যে ব্যাপক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে এবং কার্যকর তত্ত্বাবধানে তা যে প্রত্যক্ষ প্রভাব সৃষ্টি করে সে বিষয়টাকেই অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তাই অধস্তনের সংখ্যা বেশি হলে সম্পর্কের পরিধিতে যে ব্যাপকতার সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে তত্ত্বাবধান পরিসর যে একটি সীমার বাইরে নেয়া যায় না বা নেয়া উচিত নয় এ বিষয়টিই তিনি তাঁর প্রবন্ধে বলতে চেয়েছেন। যা পরবর্তীর্তে গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব বা সূত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। তিনি এ তত্ত্বে নির্বাহী ও কর্মীদের মধ্যকার সম্পর্ককে নিম্নোক্ত তিনভাগে ভাগ করেছেন:

 

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১. প্রত্যক্ষ একক সম্পর্ক (Direct single relations) :

সম্পর্ক বলতে একক নির্বাহীর সঙ্গে অধস্তন প্রতিটি কর্মীর প্রত্যক্ষ বা সরাসরি সম্পর্ককে বুঝানো হয়। একজন নির্বাহীর অধীনে যদি B ও C নামক দুজন কর্মী থাকে তবে প্রত্যক্ষ ও একক সম্পর্ক হবে ২। অর্থাৎ এরূপ সংখ্যা কর্মী বৃদ্ধির সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায় । কর্মী সংখ্যা যদি ১০ জন হয় তবে এরূপ সম্পর্ক সংখ্যা হবে ১০। নিম্নে চিত্রের সাহায্যে বিষয়টি তুলে ধরা হলো:

সমীকরণের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করলে দাঁড়াবে : DSR = N

যখন DSR = ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে অধস্তনের প্রত্যক্ষ একক সম্পর্ক (Direct single relation)

N = অধস্তনের সংখ্যা ( No. of subordinates)

২. প্রত্যক্ষ দলগত সম্পর্ক বা দলগতভাবে অধস্তনদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক (Direct group relationship) :

ঊর্ধ্বতনের উপস্থিতিতে তার অধস্তন কর্মীদের পারস্পরিক চিন্তাভাবনার ভিন্নতা সৃষ্টি হয় । যখন ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে একজন মাত্র অধস্তন মতবিনিময় করে এবং সেখানে অন্য কোনো অধস্তন উপস্থিত না থাকে সেক্ষেত্রে আলোচনা যেমন হবে কিন্তু সেখানে যদি আরেকজন অধস্তন উপস্থিত থাকে তবে উর্ধ্বতনের বক্তব্যে উপস্থিত অন্য অধস্তন সম্পর্কে উর্ধ্বতনের যে ধারণা তার কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে । এভাবে উপস্থিত অধস্তনের সংখ্যা যত বেশি হবে অন্যদের সম্পর্কে ধারণার ভিন্নতার কারণে প্রত্যক্ষ গ্রুপ সম্পর্ক ততোই বৃদ্ধি পাবে । ধরা যাক অধস্তন কর্মী সংখ্যা ২ জন (B ও C) তবে প্রত্যক্ষ দলীয় সম্পর্ক হবে:

 

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

প্রত্যক্ষ দলীয় সম্পর্ক হবে = ৯ ।

সমীকরণের সাহায্যে বিষয়টি প্রকাশ করলে দাঁড়াবে

21 DGR = n ( -1)

= 8 -1=31- -1)=3×3=9

এখন DGR = ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে অধস্তনের প্রত্যক্ষ দলীয় সম্পর্ক (Direct group relations)

n= অধস্তন কর্মীর সংখ্যা (No. of subordinates) 

৩. অধস্তনদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ( Cross relationship) :

প্রতিটি কর্মী অন্য কর্মী সম্পর্কে পৃথক মনোভাব পোষণ করার ফলে পৃথক পৃথক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। নির্বাহীর অধীনস্থদের মধ্যে এরপ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার কারণে একে আড়াআড়ি সম্পর্ক বলা হয়। ধরা যাক্ একজন নির্বাহীর অধীনে ৩ জন অধস্তন ( B, C ও D ) কর্মরত । তবে আড়াআড়ি সম্পর্ক সংখ্যা হবে ৬। যেমন : B + C, BD, C+B, C+D, D+B D+C রেখাচিত্রের সাহায্যে এরূপ সম্পর্ক নিম্নে তুলে ধরা হলো:

 

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

এরূপ সম্পর্ককে নিম্নোক্ত সমীকরণের সাহায্যে উপস্থাপন করা যায় :

CR= n(n-1) = 3 (31) = 3 x 2 = 6

এখন, CR = অধস্তনদের মধ্যকার আড়াআড়ি সম্পর্ক (Cross relations)

n=অধস্তনদের সংখ্যা (No. of subordinates) গ্রেকিউনাস পৃথক পৃথক সম্পর্ক নির্ধারণ করে তার নিবন্ধে এ কথাই বুঝাতে চেয়েছেন যে, কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিন ধরনের সম্পর্কই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় । প্রত্যক্ষ একক সম্পর্ক সমানুপাতিক হারে বাড়লেও দলীয় ও আড়াআড়ি সম্পর্ক অধিক হারে বৃদ্ধি পায় । উপরে উল্লিখিত তিনটি সম্পর্কের সূত্রকে একত্রিত করে গ্রেকিউনাস মোট সম্পর্কের একটি সূত্র দাড় করিয়েছেন । তা হলো :

 

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

n = অধস্তন কর্মীর সংখ্যা

পূর্বে উল্লিখিত তিন ধরনের সম্পর্ককে একত্রে আনলেও দেখা যাবে :

CSR + DGR + CR = 3 + 9 +6 = 18 হবে।

উপরোক্ত সূত্র অনুসারে অধস্তন কর্মীর সংখ্যা যদি বাড়ানো হয় তবে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রবণতা কেমন হবে তার একটি নমুনা নিম্নে তুলে ধরা হলো :

 

গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব | ব্যবস্থাপনা পরিসর ও বিভাগীয়করণ | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

গ্রেকিউনাস প্রদত্ত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অধস্তন কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হলে প্রতিষ্ঠানে মোট সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় । ফলে এরূপ সম্পর্ক বৃদ্ধি তত্ত্বাবধান কার্যকে জটিল করে তোলে । ফলে ব্যস্থাপনা পরিসর অধিক বড় রাখা কার্যকর তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় ।

Terry 3 Franklin এ বিষয়টাকেই of তাঁর লেখনীতে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরেছেন: “The span of control affects significantly the number of organizational relationships between the superior and the subordinates that is, as the number subordinates is increased arithmatically, the number of potential relationships increases geometrically. All this means that the tasks, responsibilities and complexities of managing can multiply as subordinates are added.”

অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ পরিসর ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনদের মধ্যকার সাংগঠনিক সম্পর্কের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে অর্থাৎ অধস্তনের সংখ্যা গাণিতিকভাবে বৃদ্ধি পেলে সম্পর্কের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো অধস্তনদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কাজ, দায়-দায়িত্ব ও নির্বাহ কর্মের জটিলতা বহুগুণে বেড়ে যায় । 

 

তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা :

ব্যবস্থাপনা পরিসর নির্ণয়ে গ্রেকিউনাস প্রদত্ত তত্ত্ব নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান । কারণ মানব সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তিনি যেভাবে তার তত্ত্বে তুলে ধরেছেন এতে এ সংক্রান্ত চিন্তায় যথেষ্ট উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে । তবে এ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাও নিছক কম নয়। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো :

১. এ তত্ত্বে মোট সম্পর্ক সংখ্যা নিরূপণে সকল ধরনের সম্পর্ককে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে । কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের সম্পর্কের গুরুত্ব সমান নয় । কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদারক কার্যের জন্য প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিবেচনা করাই যথেষ্ট।

২. এক্ষেত্রে গাণিতিক সূত্রের উল্লেখ করে মানব সম্পর্ক নিরূপণ করা হয়েছে। কিন্তু এরূপ সম্পর্কের বিষয়টি মানব আচরণের সঙ্গে মূলত সম্পর্কযুক্ত । যা গাণিতিক সূত্র দ্বারা পরিমাপযোগ্য নয় ।

৩. এ তত্ত্ব অনেকটা অনুমাননির্ভর বিশ্লেষণ মাত্র । বাস্তব উপাত্তের ভিত্তিতে তা প্রণীত হয়নি।

৪. এক্ষেত্রে শুধুমাত্র লাইন সম্পর্ক বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু লাইন নির্বাহীর সঙ্গে বর্তমানে পদস্থ কর্মীরাও ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থেকে কাজ করে । কিন্তু সে বিষয়টি এখানে ধরা হয়নি । 

৫. কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর নির্ণয়ে কাজের প্রকৃতি, কর্মী ও নির্বাহীর মান, যোগাযোগ পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত স্তর ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ । এক্ষেত্রে তাও বিবেচনা করা হয়নি ।

উপসংহারে বলা যায়, গ্রেকিউনাসের তত্ত্ব বিভিন্ন দিক হতে সমালোচিত হলেও একজন নির্বাহীর অধীনে কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধিকালে মোট সম্পর্ক সংখ্যা যে বৃদ্ধি পায় এ বিষয়টিকে কেউই অস্বীকার করেননি। এ ছাড়া সম্পর্ক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে যে কার্যক্ষেত্রে সমস্যা ও জটিলতা বৃদ্ধি পায় এ বিষয়টাও সর্বাংশে সত্য ।

যদিও কাম্য তত্ত্বাবধান পরিসর কী হওয়া উচিত এ তত্ত্বে সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না তথাপি অধস্তনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে যে সম্পর্কগত সমস্যা ও জটিলতা বৃদ্ধি পায় এ বিষয়টি এখানে সফলতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যে কারণে এ তত্ত্বের নির্দেশিকাকে সামনে রেখে কোনো নির্বাহীর বাস্তব অবস্থাদি বিবেচনাপূর্বক তত্ত্বাবধান নির্ণয় করা হলে তা হতে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব । 

Leave a Comment