আজকের আলোচনার বিযয় বাজেটারি বা বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণের সফলতার শর্তসমূহ – যা নিয়ন্ত্রণ এর অর্ন্তভুক্ত, বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত আদর্শমান কার্য সম্পাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কৌশল হিসেবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ । তাই এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে লক্ষ্য রাখতে হয় যেনো কোন ত্রুটিপূর্ণ বিষয় বা অব্যবস্থার কারণে এটি ব্যর্থতায় রূপ না নেয় । এর স্বার্থক অনুশীলনের পূর্বে যেসব শর্ত মেনে চলা আবশ্যক তা নিম্নরূপ :
Table of Contents
বাজেটারি বা বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণের সফলতার শর্তসমূহ

১. বাজেটের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্টকরণ (Specifying the objective of budget) :
বাজেটে উদ্দেশ্যের সুনির্দিষ্টতা পরিকল্পনার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে । তাই একে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত যেনো তা উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে দিক-নির্দেশ করতে পারে। এজন্য এরূপ উদ্দেশ্যও সংখ্যাত্মক মানে নির্দিষ্ট করা উচিত ।
২. শীর্ষ ব্যবস্থাপনার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন (Voluntary support of top executives) :
বাজেট প্রস্তুত এবং বাজেট অনুসরণের ক্ষেত্রে শীর্ষ ব্যবস্থাপনার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকা আবশ্যক । শীর্ষ ব্যবস্থাপকগণ বাজেট প্রণয়নকালে যদি সক্রিয়ভাবে তাদের চিন্তা ও চেতনাকে এর সাথে যোগ করে তবে স্বাভাবিকভাবেই বাজেটের মান বৃদ্ধি পায় । এছাড়া বাজেট অনুসরণকালে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানে যদি ঊর্ধ্বতনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে তবে এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অধিক কার্যকর হয় ।
৩. উপযুক্ত বাজেটকাল নির্ধারণ (Determining proper budget period) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য প্রতিষ্ঠানের কোন্ পর্যায়ে কত সময়ের জন্য বাজেট প্রণীত হবে এবং বিভিন্ন সময়ের বাজেটকে কীভাবে সমন্বিত করা যাবে তাও পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক বাজেট সংক্ষিপ্ত ও অধিক সময় সাপেক্ষ হয় । কিন্তু কোনো উৎপাদন কেন্দ্রের বাজেট স্বল্প সময়সাপেক্ষ ও বিশদ বর্ণিত হয় । তাই কোন্ পর্যায়ে বাজেটের সময়কাল কী হবে তা পূর্ব নির্দিষ্ট ও যথোপযুক্ত হলে কার্যক্ষেত্রে তা অধিক ফল দেয় ।
৪. বাজেটে ব্যবহৃত প্রাক্কলনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা (Balancing in planning premises) :
বাজেটে ব্যবহৃত প্রাক্কলন এমন হওয়া উচিত যেন আদর্শ মান বাস্তবায়নে এটি প্রকৃত ভিত্তি হতে পারে । অর্থাৎ বাস্তবতার সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে বাজেটে প্রাক্কলনের ব্যবহার করা উচিত । প্রাক্কলন বলতে বাজেট যে অবস্থার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে সেই সম্বন্ধে সঠিক অনুমান প্রতিষ্ঠাকে বুঝায় ।
৫. বাজেট প্রস্তুতকালে অগ্রাধিকার নির্ণয় (Assessing priority in preparing budget) :
বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বাজেট প্রস্তুত করা হয়; যেমন- ক্রয়, বিক্রয়, উৎপাদন ইত্যাদি। এদের মধ্যে যে প্রধান বিষয়টি কেন্দ্র করে অন্যান্য বিষয়গুলো আবর্তিত হয় সে বিষয়ের বাজেট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রণয়ন করা উচিত । এজন্য কোটি অগ্রাধিকার পাবে তা পূর্ব থেকেই সঠিকভাবে নির্ধারণ করা আবশ্যক ।
৬. বাজেট বর্হিভূত ঘটনা মোকাবিলা (Protection of extra-budget event) :
যখনই বাজেট বহির্ভূত বা অদৃশ্যপূর্ণ ঘটনার সমাবেশ ঘটে তখনই বাজেট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট নির্বাহীকে প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিতে হয় । তাই কোন্ অবস্থায় নির্বাহী, ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর নির্দেশনা নেবে যদি তা পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট থাকে তবে এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার যথার্থ ব্যবহার সম্ভব হয় ।
৭. প্রেষণা বিবেচনায় বাজেট প্রস্তুতকরণ (Budget preparing in consideration of motivation) :
বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সফল করার ক্ষেত্রে অবশ্যই তা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য প্রেষণামূলক হওয়া আবশ্যক । এজন্য বাজেট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকদের যথাসম্ভব এর সাথে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক । শুধু বাজেট প্রস্তুতকালে কর্মীদের অংশগ্রহণই নয় বাজেট বাস্তবায়নকালে তাদেরকে যথাসময়ে নির্দেশ প্রদান, উপযুক্ত তত্ত্বাবধান এবং বাজেট ফল অর্জনের জন্য যথাযথ পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে উৎসাহিতকরণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানে থাকা আবশ্যক ।
৮. সমন্বয় সাধন (Co-ordination) :
সুসমন্বিত বাজেট প্রণীত না হলে তা কার্যক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তোলে । তাই এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সুসমন্বিত বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া উচিত । বাজেট প্রণয়নকালে বিভিন্ন বাজেটের মধ্যে সমন্বয় বিধান করা হলে পরবর্তীতে যেমনি উক্ত বাজেট হতে সুফল লাভ করা যায় তেমনিভাবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপও সহজসাধ্য হয় ।
৯. ফলাবর্তন ব্যবস্থা (Feedback system) :
বাজেটের কার্যকারিতা বা ব্যর্থতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে যথার্থ রিপোর্টিং পদ্ধতি চালু থাকা আবশ্যক । কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থাও ঊর্ধ্বতন ও অধস্তনদের মধ্যে কাজের অগ্রগতি বিষয়ে তথ্য প্রবাহে সহায়তা করে। সমস্যা সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন দ্রুত জানতে পারে । তাই কার্যকর ফলাবর্তন ব্যবস্থা বাজেটারি নিয়ন্ত্রণকে ফলপ্রদ হতে সহায়তা করে ।

১০. বাজেটে নমনীয়তা অর্জন (Acquiring flexibility in budget) :
ভবিষ্যতের সাথে অনিশ্চয়তা সম্পর্কযুক্ত বিধায় ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি সর্বদাই পরিবর্তনশীল । তাই বাজেট প্রণয়নকালে লক্ষ্য রাখা আবশ্যক যে বাজেটের বিষয়গুলো যাতে পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করা যায়। এজন্য যদি প্রতিষ্ঠানে আদর্শ পদ্ধতি চালু থাকে তবে তা এরূপ ব্যয় পদ্ধতি, বিকল্প বাজেট, পরিবর্তনশীল বাজেট বা পর্যায়ক্রমিক সমীক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে সহায়তা করে ।
পরিশেষে বলা যায়, স্বার্থক বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সমস্ত শর্তাবলি বিবেচনা করা হয় তা সর্বক্ষেত্রে একই ফলাফল প্রদান করে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্রভেদে এর যথাযথ বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করতে পারে ।
