উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ

উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” উদ্দেশ্য” বিষয়ক পাঠের অংশ। উদ্দেশ্য একটি সংগঠনের গড়ে ওঠার যৌক্তিকতা বিচার করে, ভবিষ্যতের কার্যক্রমের সীমা নির্ধারণ করে। এবং সর্বোপরি একে ঘিরে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপকীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ।

উদ্দেশ্যের এরূপ গুরুত্ব বা তাৎপর্যের কারণে একজন ব্যবস্থাপককে উদ্দেশ্য নির্ধারণে অত্যন্ত যত্নবান হতে হয় । উদ্দেশ্যকে কার্যকর বা ফলপ্রদ বলা যাবে যদি তা কতিপয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয় । নিম্নে উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের প্রধান প্রধান গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো :

 

উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. সুস্পষ্ট ও বোধগম্য (Specific and understandable) :

উদ্দেশ্য এমন হওয়া উচিত যাতে তা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও বোধগম্যতার সঙ্গে ভবিষ্যতের কাঙিক্ষত ও অর্জনীয় ফলাফল প্রকাশ করে। Pearce ও Robinson -, “Any objective should be stated in specific terms so that it is understandable to all concerned.” 5 অর্থাৎ যেকোনো উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট তা বোধগম্য হয় । উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করার কারণ হলো ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দূর করা-যাতে ব্যক্তি, দল ও সংগঠন সামগ্রিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারে ।

২. পরিমাপযোগ্য (Measurable) :

উদ্দেশ্যের পরিমাপযোগ্যতা হলো সংখ্যাত্মক বা গুণবাচক পরিমাপকে উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করা । পরিমাপযোগ্যতার অভাবে ব্যবস্থাপক তার মনোযোগ ও দৃষ্টি অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের দিকে নিবদ্ধ করেন। এতে কাঙিক্ষত ফলাফল অর্জিত হয় না। পিয়ার্স ও রবিনসন-এর মতে, “Measurable objectives provide managers with a way to monitor and evaluate performance, interpret feedback, and achieve control.” 6 অর্থাৎ পরিমাপযোগ্য উদ্দেশ্য ব্যবস্থাপকের জন্য কার্যফলাফল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, ফলাবর্তনের ব্যাখ্যা ও নিয়ন্ত্রণের পথনির্দেশ করে ।

৩. সময় মেয়াদ (Time frame) :

উদ্দেশ্যের দ্বারা প্রকাশিত কাঙিক্ষত ফলাফলকে একটি নির্দিষ্ট সময় মেয়াদের কাঠামোতে আবদ্ধ রাখা আবশ্যক । সময় মেয়াদের অন্তর্ভুক্তি না থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে কী অর্জন করা হবে তা অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক হয়ে পড়ে। সময়ের নিরিখে উদ্দেশ্যসমূহকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য হিসেবে নির্দিষ্ট করতে হয় ।

৪. সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক (Concise and relevant) :

দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি উদ্দেশ্যসমূহকে কার্যকর করার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো উদ্দেশ্য বর্ণনায় প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করা।। সংক্ষিপ্তভাবে উদ্দেশ্য প্রকাশকালে প্রত্যাশিত ফলাফল ও তা অর্জনের জন্য করণীয় কী কী হবে তার ইঙ্গিত থাকতে হবে ।

৫. আদর্শমানের চেয়ে বেশি (Above standard) :

আদর্শমান হলো ব্যক্তি, দল বা সাংগঠনিক বিভাগ কর্তৃক অর্জনযোগ্য ন্যূনতম কার্যফলাফল । উদ্দেশ্যে নির্দিষ্টকৃত কার্যফলাফল অবশ্যই আদর্শমানের সমান কিংবা বেশি হতে হবে । কখনই আদর্শমানের চেয়ে কম প্রত্যাশা করা যাবে না ।

 

৬. বাস্তবসম্মত (Realistic) :

উদ্দেশ্য অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে । খুব উচ্চমাত্রার উদ্দেশ্য কর্মীদেরকে হতাশ করে আবার খুব নিম্নমাত্রার উদ্দেশ্য কর্মীদের মনে কোনো প্রকার সাফল্যার্জনের প্রভাব ফেলতে পারে না । তাই উদ্দেশ্য হতে হবে এমন পর্যায়ের যা অর্জনযোগ্য তবে খানিকটা চ্যালেঞ্জধর্মী গবেষণায় দেখা গেছে, এ জাতীয় উদ্দেশ্য অর্জনের দ্বারা কর্মীরা এক ধরনের প্রণোদনা পায় |

৭. নমনীয়তা (Flexibility) :

ভবিষ্যতের অনভিপ্রেত বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উদ্দেশ্যের মাঝে  প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা পরিমার্জন সাধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। 

 ৮. গ্রহণযোগ্যতা (Acceptability) :

উদ্দেশ্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে । পিয়ার্স ও রবিনসন-এর মতে, “An objective is more effective when it is acceptable to the people responsible for accomplishing it.” 7 অর্থাৎ কোনো উদ্দেশ্য তখনই অধিকতর কার্যকর হবে যখন তা অর্জনের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্তদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে ।

৯. অর্জনযোগ্যতা (Attainability) :

যদিও লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে কর্মীদের সামনে চ্যালেঞ্জধর্মী হিসেবে প্রকাশ করতে হয়, তা সত্ত্বেও উদ্দেশ্য এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তা অর্জন করা কর্মীদের পক্ষে সম্ভবপর হয় । বার্টল ও মার্টিন-এর মতে, “Although goals need to be challenging, they usually work best when they are attainable.” 8 কর্মীদেরকে সব সময় কঠিন বিষয়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার তাগিদ দিলেও উদ্দেশ্য অর্জনযোগ্য হলেই ধারাবাহিকভাবে কার্যসম্পাদনে সফলকাম হওয়া সম্ভব ।

 

উত্তম ব্যবস্থাপকীয় উদ্দেশ্যের গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ | উদ্দেশ্য | ব্যবস্থাপনা নীতিমালা

 

১০. উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকার (Goal commitment) :

উদ্দেশ্যকে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্দেশ্যার্জনের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকার হলো লক্ষ্যার্জনের জন্য উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা। বার্টল ও মার্টিন-এর ভাষায়, “Without commitment, setting specific, challenging goals will have little impact on performance. 

উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলির সর্বোচ্চ সমন্বয়ের মাধ্যমে উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যায় । ব্যবস্থাপকীয় সকল কর্মকাণ্ডের ভিত্তিভূমি হিসেবে উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্য বা গুণসমূহ অবশ্যই যথাযথভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক ।

Leave a Comment