উদ্দেশ্যের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “ব্যবস্থাপনা নীতিমালা” বিষয়ের ” উদ্দেশ্য” বিষয়ক পাঠের অংশ। ব্যবসায় সংগঠন ও তার ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হলো কোনো প্রকাশ্য লক্ষ্য অর্জন করা । উদ্দেশ্যের অস্তিত্ব না থাকলে কোনো সংগঠনই গড়ে উঠতো না এবং ব্যবস্থাপকীয় কার্যক্রমের প্রশ্নই উঠত না। G. R. Terry বলেছেন, Having purpose management evolves around objectives. ” অর্থাৎ উদ্দেশ্য আছে বলেই তাকে ঘিরে ব্যবস্থাপনার বিকাশ ঘটেছে।
অনুরূপভাবে পিটার এফ. ড্রাকার অভিমত দিয়েছেন, “All managers should manage by objectives. ” 11 অর্থাৎ সকল ব্যবস্থাপকেরই উচিত উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা কর্ম নির্বাহ করা। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নির্দিষ্টকরণে এবং ব্যবস্থাপকীয় কার্যক্রম পরিচালনায় উদ্দেশ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। নিয়ে উদ্দেশ্যের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হলো:
Table of Contents
উদ্দেশ্যের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা

১. পরিকল্পনা প্রণয়নের ভিত্তি (Premises for planning) :
ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ও মৌলিক কাজ হলো রাখে। Pearce & Robinson-এর মতে, “Objectives are a central, concrete mechanism the planning process real focused and meaningful.” 12 অর্থাৎ পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকে বাস্তব, আলোচিত এবং অর্থবহ করার প্রধান ও সুনির্দিষ্ট কৌশল হলো উদ্দেশ্য। এ কারণেই উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট ও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয় ।
২. উদ্দেশ্য কার্যনির্দেশ দেয় (Objectives provide guidance) :
প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিক ও দলীয় কর্মপ্রয়াসকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা কার্যনির্দেশিকা দেয়ার জন্য সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টকৃত উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কার্য ফলাফল ও উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠার মাঝে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে ।
৩. উদ্দেশ্য অনিশ্চয়তা হ্রাস করে (Objectives reduce uncertainty) :
অনিশ্চয়তা সাংগঠনিক ব্যবস্থাপকীয় সমস্যার একটি অন্যতম সাধারণ কারণ । প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করলে কর্মীরা অনিশ্চয়তা ও নির্দেশনাহীনতার সমস্যা থেকে মুক্ত থাকে। Pearce & Robinson-এর মতে, “Objectives act as facts to guide behaviour, thereby increasing the predictability of cause and effect relationships.”13 অর্থাৎ উদ্দেশ্য কর্মীদের আচরণ নির্দেশকারী হিসেবে কাজ করে, ফলে ঘটনার কার্যকরণগত সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষমতা বাড়ায় ।
৪. উদ্দেশ্য কর্মীদের প্রণোদনা দেয় (Objectives motivate employees) :
মনস্তাত্ত্বিকভাবে কর্মীরা বাস্তবধর্মী ও অর্জনযোগ্য উদ্দেশ্য দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে কাজের প্রতি উৎসাহী হয়। কর্মীরা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হলে তাদের কাজের ফলাফল ও প্রাপ্তি সম্পর্কেও ধারণা পায়, ফলে তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয় । এছাড়াও নতুন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কর্মীদের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে । ফলে উন্নততর কার্য ফলাফলে কর্মীরা আরো বেশি সচেষ্ট হয় ।
৫. উদ্দেশ্য সমন্বয় সহজ করে (Objectives allow co-ordination) :
সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যক্তি, দল ও ইউনিট এবং বিভাজিত কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়সাধনকে সহজতর করে। Pearce & Robinson- এর মতে, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বিভাজিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাঝে সমন্বয়ের জন্য উদ্দেশ্য লিংকিং-পিন্ বা সংযোগকারী খুঁটি হিসেবে কাজ করে। “Objectives provide a ‘linking pin’ to co-ordinate diverse organizational activities. “
৬. উদ্দেশ্য শিক্ষণ কার্যকে সহজতর করে (Objectives facilitate learning ) :
উদ্দেশ্য নির্ধারণ ও তা সকল প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের কর্মীদের জ্ঞাত করানোর মাধ্যমে ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবস্থাপকীয় কলাকৌশল শিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যবস্থাপকীয় জ্ঞান ও নৈপুণ্যের প্রসার ঘটে ।
৭. সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা (Establishing organization structure) :
নির্ধারিত উদ্দেশ্যর ভিত্তিতে প্রত্যেক পদ ও কর্মীর দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়। এতে সহজে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা Kast & Rosenweig “Goals or objectives provide a basis for structural design and setting of the initial constraints for determining the appropriate structure. “15
৮. সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যফলাফলে উন্নতি (Improvement in overall organization performance) :
সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করে । কাজের প্রতি অঙ্গীকার বা আগ্রহ বাড়ায় এবং অনিশ্চয়তা দূর করে বিধায় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যফলাফলের মান উন্নত হয়। কার্ল আর. এন্ডারসন-এর মতে, “ব্যবস্থাপকগণ কী অর্জন করতে চায় সে বিষয়ে নির্দেশনা পাওয়া যায় লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যর দ্বারা, ফলে সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যফলাফল উন্নত হয়।” (Overall organization performance is improved because goals provide direction toward what it is that managers want to achieve.)
৯. নিয়ন্ত্রণে সহায়ক (Aid to control) :
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকীয় নিয়ন্ত্রণ কাজের ও কার্যফলাফল পরিমাপের আদর্শ বা পরিমাপক হলো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য । এ প্রসঙ্গে কার্ল এন্ডারসন-এর অভিমত হলো, “Goals also allow for increased control in organizations, getting people back on track if they deviate from plans.” ” অর্থাৎ লক্ষ্য সংগঠনে বর্ধিত আকারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ সহজ করে এবং কর্মীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে যদি তারা পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হয়।

১০. কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন (Evaluation of progress) :
সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত ও পরিমাপযোগ্য উদ্দেশ্য কার্য পরিমাপের আদর্শ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে ব্যবস্থাপকগণ কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করতে পারে ।
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা ব্যবস্থাপনার একটি আবশ্যকীয় বিষয় । এ কারণেই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য নির্ধারণে অত্যন্ত যত্নবান ও সচেতন হওয়া আবশ্যক । এ কারণে GR. Terry মন্তব্য করেছেন “The importance of objective is widely accepted; most managers agree that they are vital. Inappropriate and inadequate objectives can retard the management and suffocate the operations of any organization. “
