আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ব্যবস্থাপনা চিন্তাধারার চার যুগ বা সময়কাল ।যা ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অধ্যায় এর অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
ব্যবস্থাপনা চিন্তাধারার চার যুগ বা সময়কাল

সুদীর্ঘকাল ধরে ব্যবস্থাপনা চিন্তাধারার যে ক্রমবিকাশ ঘটেছে অর্থাৎ আধুনিক ব্যবস্থাপনা তত্ত্বের উন্নয়নের ধারাকে চারটি সময়কালে ভাগ করা যায়, যথা :
(ক) প্ৰাক-বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা (Pre-scientific management);
(খ) বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা (Scientific management);
(গ) মানবিক সম্পর্ক (Human relations) এবং
(ঘ) ব্যবস্থাপনা তত্ত্বসমূহের সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন (Refinement extension and synthesis of management theories) |
(ক) প্রাক-বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা যুগ (Pre-Scientific Management Period) :
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্থে গ্রেট ব্রিটেনে শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়, যাকে শিল্পবিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয়। শিল্পবিপ্লবের শুরু থেকে ঊনিশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সময়কালকে প্রাক-বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা যুগ বলে গণ্য করা হয়।
এ সময়ে মুনাফা অর্জনকেই প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রধান মাপকাঠি বলে গণ্য করা হত। তখন ধারণা করা হত ব্যবস্থাপনা, জ্ঞান বংশানুক্রমে সংক্রমিত হয়; এ জ্ঞান সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং একজন অন্যজনকে এ জ্ঞান বিতরণ করতে পারে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুই শতকে এসব গতানুগতিক ধারণার ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা দেয়।
এ সময়ে শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়ায় উৎপাদন ক্ষেত্রে কায়িক শ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রপাতির আবির্ভাব ঘটে। হারগ্রীভস, রিচার্ড আর্করাইট, ক্রম্পটন, জেমস ওয়াট, বোলটন, মারডক প্রমুখ ব্যক্তিদের আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি, বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও বাষ্পীয় গতিশক্তির আবিষ্কারের ফলে শিল্পের প্রকৃতিই পাল্টে যায় এবং গার্হস্থ্য উৎপাদন ব্যবস্থা কারখানা উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপ লাভ করে।
এতে করে উৎপাদন ব্যবস্থায় যেমনি ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়, বৃহদায়তন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠতে থাকে তেমনি সেই সাথে এদের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সমস্যার দেয় এবং উদ্ভূত সমস্যাবলির মোকাবেলা করতে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার সাধন করতে হয়।
উদ্ভব হতে থাকে এবং তা ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করে। এ পরিস্থিতিতে শিল্প-ব্যবস্থাপনার উন্নতির আবশ্যকতা দেখাক-বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার যুগে অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবকালে যাঁরা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে জেমস ওয়াট ও রবিনসন বোলটন, রবার্ট ওয়েন, চার্লস ব্যাবেজ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য। নিম্নে ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরা হল :
জেমস ওয়াট ও রবিনসন বোল্টন : ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে তাদের অবদান হল :
(ক) উৎপাদন পরিকল্পনা;
(খ) উৎপাদনের আদর্শ মান নির্ণয়;
(গ) কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানের ধারণা, ইত্যাদি।
• চার্লস ব্যাবেজ :
সময় নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে চার্লস ব্যাবেজ ছিলেন টেলরের পূর্বসূরী। ব্যাবেজ প্রক্রিয়াসমূহে ভারসাম্যের গুরুত্ব এবং উৎপাদিত দ্রব্যের প্রতিটি শ্রেণির জন্যে নির্মাণ এককের কাম্য আকৃতির উপর জোর দেন। এমন অনেক বিষয় নিয়ে ব্যাবেজ আলোচনা করেছেন, যাতে নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ অন্তর্ভুক্ত-
(ক) উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ব্যয় বিশ্লেষণ;
(খ) সময় নিরীক্ষণ সম্পর্কিত কৌশল ব্যবহার;
(গ) অনুসন্ধানের জন্য মুদ্রিত ও নির্ধারিত মানের ফরমের ব্যবহার;
(ঘ) ব্যবসায়ের রীতিনীতি অধ্যয়নের জন্য তুলনামূলক পদ্ধতির ব্যবহার;
১। শ্রমিকরা নিজেই নিজেদের কার্য সম্পাদন করত, কোন প্রকার নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
২। শ্রমিকেরা কী কাজ করবে, কখন করবে, কীভাবে করবে ব্যবস্থাপনা তা শ্রমিকদেরকে পূর্ব হতে অবহিত করত না,
৩। উপযুক্ত লোককে উপযুক্ত কাজে নিয়োগ করা হত না,
৪। উৎপাদন ছিল সীমিত ও ৫। ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকের মধ্যে কোন প্রকার সহযোগিতা ছিল না। তদুপরি ব্যবস্থাপনা সকল কাজ ও দায়িত্ব শ্রমিকের উপর ন্যস্ত করত।
এ সকল অব্যবস্থা ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে টেলর অনুধাবন করলেন যে, উৎপাদন ব্যবস্থায় পুরোপুরি পরিবর্তন এনে উৎপাদনের গুণগত ও পরিমাণগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। তাই তিনি গবেষণার মাধ্যমে প্রচলিত রীতি ও কৌশলের স্থলে বৈজ্ঞানিক নীতি ও পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।
তাঁর উদ্ভাবিত নীতি ও পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা বলে অভিহিত করা হয়। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। ব্যবস্থাপনায় তাঁর প্রধান অবদানগুলো হচ্ছে- পরিকল্পনা কার্যাবলিকে করণীয় কার্যাবলি হতে পৃথকীকরণ, পার্থক্যজনিক মজুরি প্রথা, সময় নিরীক্ষা, গতি নিরীক্ষা, কার্যভিত্তিক ফোরম্যানশিপ। তা ছাড়া তিনি শ্রমিকদেরকে পুরোপুরিভাবে উত্তম শ্রমিকে পরিণত করার জন্য চারটি নীতি প্রণয়ন করেন, যা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার নীতি বলে স্বীকৃত।
হেনরি ফেয়ল (Henry Fayol) :
টেলরের পর ফরাসি শিল্পপতি হেনরি ফ্যেলের নামও সমান গুরুত্বের সাথে এক্ষেত্রে উচ্চারিত হয়। টেলর এবং ফেয়লের চিন্তাধারা পরস্পর পরিপূরক ছিল। ফেলে উপর হতে সংগঠনের নিম্নধাপ পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা ও কর্মীর কার্য নির্দিষ্টকরণের পরামর্শ প্রদান করেন। অন্যদিকে টেলর বিশেষজ্ঞ কার্যনির্বাহী কর্তৃক প্রত্যেক শ্রমিকের কাজ পূর্বেই নির্দিষ্ট করার পরামর্শ দেন।
হেনরি লরেন্স গ্যান্ট (Henry Laurence Gantt) : টেলরের পর হেনরি লরেন্স গ্যান্ট বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে অবদান রাখেন। তিনি টেলরের একজন সহগামী ও সহকর্মী ছিলেন। তাঁর বড় অবদান হচ্ছে কার্য ও বোনাস পরিকল্পনা। তিনি ব্যবস্থাপনার মানবিক উপাদানের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ‘গ্যান্ট চার্ট’ উদ্ভাবন করেন।
• ফ্রাঙ্ক গিলব্রেথ (Frank Gillbreth) :
গিলব্রেথ দম্পতিও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে অবদান রাখেন। ফ্রাঙ্ক গিলব্রেথ গতি ও সময় নিরীক্ষণের বেশ উন্নতি ঘটান। তিনি কাজের মধ্যে গতির মোট সতেরটি উপাদান লক্ষ করেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা-ভাবনার সাক্ষর রাখেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক কর্মী তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট হতে প্রশিক্ষণ লাভ করবে, পরে সে নিজে তার অধঃস্তনকে প্রশিক্ষণ দিবে এবং নিজ কার্য দক্ষতার সাথে সম্পাদন করে পদোন্নতির সুযোগ গ্রহণ করবে। তিনি সময় নিরীক্ষণের জন্য “মাইক্রোনোমিটার’ ঘড়ি উদ্ভাবন করেন। তাঁর স্ত্রী লিলিয়ান গ্রিলবেথ ক্লান্তি নিরীক্ষার উন্নয়নে অবদান রাখেন।

