আজকের আলোচনার বিযয় বাজেটারি বা বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণের সুবিধা- যা নিয়ন্ত্রণ এর অর্ন্তভুক্ত, আধুনিককালে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহে বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যাকার্য নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে স্বীকৃত । একে ‘Guide to action’ বলা হয়ে থাকে । বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানে চালু থাকলে প্রশাসনিক দুর্বলতা ধরা পড়ে এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় । তাই একে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারলে নানাবিধ সুবিধা লাভ করা যায় । নিম্নে এর সুবিধাগুলো আলোচনা করা হলো :
Table of Contents
বাজেটারি বা বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণের সুবিধা

১. পরিকল্পনার মানোন্নয়ন (Developing quality plan) :
বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কার্যকর বাজেট প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত আয়-ব্যয় নির্ধারণ, উৎপাদনের পরিমাণ, বিক্রয়ের পরিমাণ ইত্যাদি নানান বিষয়ের সংখ্যাত্মক মান প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা করতে যেয়ে ভবিষ্যৎ অবস্থার যথাযথ বিশ্লেষণ করা হয় এবং অতীত বাজেটের কার্যকারিতা অত্যন্ত যত্নের সাথে বিবেচনায় আনা হয় । যা পরিকল্পনার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।
২. পরিকল্পনা ও কর্মসূচির সহজ বাস্তবায়ন (Easy implementation of plans and programmes) :
বাজেটীয় নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপকের করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেয় । ফলে এটি বাজেটের প্রাক্কলন (Estimate) -এর সাথে পরিকল্পিত ফলাফলের বাস্তবসম্মত তুলনা করে বিচ্যুতি নিরূপণ করতে সহায়তা করে । যে কারণে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় ।
৩. লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন (Achievement of goals and objectives) :
বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনকে সহজ ও নিশ্চিত করে । কারণ এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত বাজেটের একটা সংখ্যাত্মক লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট থাকে । ফলে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় । বার্ষিক বাজেটের ক্ষেত্রে একে মাসিক পর্যায়ে ভাগ করলে প্রকৃত কার্যফল মাসে কী হচ্ছে বা কোন্ দিকে এগুচ্ছে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় । ফলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কাজকে লক্ষ্যপানে পরিচালনা করা সহজ হয়।
৪. প্রকাশিত দুর্বলতা দূরীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ (Initiating actions for overcoming the weakness):
এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বাজেটের সাথে প্রকৃত ফলের তুলনা করে বিচ্যুতি নিরূপণ যেমন সহজ হয় তেমনি বিচ্যুতির মাত্রা এবং এর কারণ সম্পর্কেও দ্রুত ধারণা লাভ করা যায় । ধরা যাক মাসিক বিক্রয় হওয়ার কথা ছিল ১০ হাজার একক পণ্য হিসেবে ১০ লক্ষ টাকা । এখন বিক্রয় হয়েছে ৮ লক্ষ টাকা । তাহলে ২ হাজার একক বা ২ লক্ষ টাকা কম বিক্রয়ের কারণ সকল দিক বিবেচনায় সহজ হতে পারে। এভাবে দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এক্ষেত্রে অধিক সহজ ।
৫. স্বার্থক সমন্বয় (Successful co-ordination) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যক্ষেত্রে স্বার্থক সমন্বয় বিধানেও কার্যকর সহায়তা প্রদান করে । এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধীনে সামগ্রিক বাজেট প্রণয়ন করতে যেয়ে বিভাগীয় বাজেটগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বিধানের প্রয়াস নেয়া হয় । এভাবে উপবিভাগীয় পর্যায়ের বাজেটে সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভাগীয় বাজেট তৈরি হয়। বাজেট পরিকল্পনায় কার্যকর সমন্বয় সাধিত হওয়ায় কার্যক্ষেত্রেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে । কোথাও কোনো বিচ্যুতি হলে প্রয়োজনে বাজেট সংশোধনেও সমন্বয়ের বিষয়টি সহজে নিশ্চিত করা যায়।
৬. দায়িত্ববোধ ও কর্মে উদ্দীপনা সৃষ্টি (Creation of sense of responsibility and enthusiasm for work) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রত্যেক নির্বাহী তাকে নির্দিষ্ট সময়ে কী করতে হবে, কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব কী হবে এ সম্পর্কে ধারণা পায় । ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করে । যা প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং নির্বাহীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে । কাজের সুস্পষ্ট পথ নির্দেশিকা থাকায় তা অধস্তনদের কাজে উদ্দীপনা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে।
৭. ক্ষতিকর ও অপচয়মূলক সিদ্ধান্ত রোধ ( Prevention of detrimental and wasteful decisions) :
ব্যবসায়ের সাফল্য অপচয়মূলক ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত দূরীভূত করার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল । এক্ষেত্রে বাজেট প্রণয়নে ভবিষ্যতে কী করা হবে, কী করা প্রয়োজন-এর আর্থিক সুবিধা ও অসুবিধার বিভিন্ন দিকের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয় । তাই তা সংগঠনের যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে ব্যবসায়ের কার্যাবলিকে সঠিকভাবে পরিচালিত করে।
৮. ব্যতিক্রম নীতি অনুসরণ (Following principle of exception) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অনুসরণ করা হলে তা দ্রুত বিচ্যুতি নিরূপণের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বল দিকগুলোর প্রকাশ করে। ফলে ব্যবস্থাপনা প্রকাশিত দুর্বলতা রোধে প্রয়োজনীয় কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এভাবে একজন ব্যবস্থাপকের মনোযোগ দুর্বলতম স্থানে নিবিষ্ট করে এরূপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবস্থাপকদেরকে ব্যতিক্রমী নীতির অনুসরণ করতে সাহায্য করে ।
৯. মিতব্যয়িতা অর্জন (Achieving economy) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি বড় সুবিধা হলো, এতে কত খরচে কোন্ সময়ে কতটা কাজ করা যাবে তার সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকে। ফলে প্রতিটা বিভাগ, উপবিভাগ ও কর্মীগণ বাজেট সীমার মধ্যে থেকে ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা করে । যে কারণে সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণ হ্রাস পায় ও মিতব্যয়িতা অর্জন সহজ হয়।

১০. দক্ষতা বৃদ্ধি (Increasing efficiency) :
এরূপ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানের বা ব্যবস্থাপনার দক্ষতার উন্নয়নেও কার্যকর সহায়তা প্রদান করে । প্রতিটা বিভাগ ও উপবিভাগের বাজেট প্রণয়নকালে ব্যবস্থাপকদেরকে | ভবিষ্যত অবস্থাদি সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করতে হয় । বাজেট প্রণয়ন ও বাজেটের অনুসরণ করতে যেয়ে ব্যবস্থাপকদের মধ্যে এক ধরনের আত্মসচেতনতা, পরিমিতিবোধ ও আনুগত্যপরায়ণতার সৃষ্টি হয়। যা তাদের দক্ষতার উন্নয়নে ভূমিকা রাখে ।
ক্ষতিকর বিষয় রোধ করা যায় এবং কার্যক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। যে কারণে বর্তমান রাষ্ট্রীয় পরিশেষে বলা যায় যে, বাজেটারি নিয়ন্ত্রণ হলো একটি বিরামহীন প্রক্রিয়া । যার সাহায্যে যাবতীয় অপচয় ও র্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডের পাশাপাশি বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহেও এর ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
